পুলিশের সাহসিকতা ও কর্মদক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানজনক ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ (বিপিএম) ও ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক’ (পিপিএম) নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠায় শেষ পর্যন্ত পদক স্থগিতই করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
শনিবার রাতে সরকারের হাইকমান্ডের নির্দেশে পদক প্রদান অনুষ্ঠান স্থগিত করে পুলিশ সদর দপ্তর।
‘তদবিরে সিন্ডিকেটে’ পুলিশ পদক শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হয় দেশ রূপান্তরে। তদবির করে কোন কোন কর্মকর্তা ও সদস্য পদকের জন্য মনোনীত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন, আবার ভালো কাজ করেও পদক জোটেনিসহ নানা তথ্য ছিল ওই প্রতিবেদনে। এতে টনক নড়ে পুলিশ সদর দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। তা ছাড়া পুলিশ পদক নিয়ে নানা অভিযোগ ও অনিয়ম ওঠায় সরকারের হাইকমান্ডও ব্যাপক ক্ষুব্ধ হয়। পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় ওঠে।
শনিবার রাতে পদক স্থগিতের বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন পদক প্রদান কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি (অপারেশন) রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, অভিযোগ ওঠায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানটি স্থগিত করা হয়। পুলিশ সপ্তাহের পর আরও যাচাই-বাছাই করে পদকের জন্য মনোনীতদের তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।
জানা গেছে, পুলিশ সপ্তাহের প্রথম দিনে আজ রবিবার পুলিশের মর্যাদাপূর্ণ বিপিএম ও পিপিএম পদক প্রদানের কথা ছিল। গত দুই সপ্তাহ ধরে এর প্রস্তুতি ও প্যারেড অনুশীলন চলছিল। নিয়ম অনুযায়ী পদক প্রদানের আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি আদেশ (জিও) জারি হওয়ার কথা থাকলেও শনিবার রাত ১২টা পর্যন্ত কোনো আদেশ জারি করা হয়নি।
পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও অনেকে তদবির ও রাজনৈতিক কানেকশনে পদক বাগিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও হয়েছে একই কারবার। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ভালো কাজ করায় অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের সদস্যরা আবেদন করেও পদক পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। তদবির করতে না পারায় কাক্ষিত ‘সোনার হরিণের’ ধারেকাছেও যেতে পারেননি। এতে ক্ষোভ ঝাড়ছেন অনেকেই। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও আগের মতোই সবকিছু হচ্ছে বলে বঞ্চিতদের অভিযোগ।
জানা গেছে, রবিবার (১০ মে) থেকে শুরু হতে যাওয়া পুলিশ সপ্তাহে ১০৯ জন সদস্যকে পদক দেওয়ার জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। অভিযোগ ওঠে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদকপ্রাপ্ত এবং দলীয় অনুগত হিসেবে পরিচিত ১১ জন কর্মকর্তা এবারের তালিকায়ও স্থান পেয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ ‘কথিত জঙ্গি’ দমনে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা, কেউ প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ‘ভাগনে কোটায়’ সুযোগ পাওয়া, আবার কেউ জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’কাণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রাখার পরও তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। খোদ পুলিশের অভ্যন্তরেই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে ত্যাগী ও দক্ষ অনেক কর্মকর্তা এবারও বঞ্চিত হওয়ায়। বঞ্চিত এক কর্মকর্তা বলেন, অতীতে সফল অভিযান চালিয়েও তার নাম কেটে দিয়ে তৎকালীন ডিআইজি নিজের নামে পদক নিয়েছিলেন। এবারও আবেদন করেও তিনি তালিকায় জায়গা পাননি।
পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনী দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে পদক গ্রহণের কথা ছিল মনোনীতদের। কিন্তু প্রকাশিত সংবাদে পদকপ্রত্যাশীদের অতীত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় প্রশাসনের উচ্চমহল বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদক দেওয়ায় এই সম্মানের গৌরব ম্লান হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার সেই পুরনো ধারার পুনরাবৃত্তি রোধে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তাকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সচেতন মহল। স্থগিত হওয়া এই অনুষ্ঠান কবে নাগাদ হবে, তা পরবর্তীতে জানানো হবে।
নাম প্রকাশ না করে পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের পর বিশৃঙ্খল অবস্থায়ও দিন-রাত কাজ করেছি। অনেক ক্লুলেস মামলার রহস্য উদঘাটন করেছি। একটা মামলার সঙ্গে আটটি খুনের রহস্যও উদঘাটন করেছি। আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য এ কাজে অংশ নিয়েছিলেন। পিপিএম পদকের জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু চোখের সামনে অনেকেই রাজনৈতিক তদবিরে বিপিএম ও পিপিএম পদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন। অথচ তদবির করার লোক না থাকায় আমিসহ টিমের কোনো সদস্যই পদক পেলাম না। তাহলে এত কষ্ট করে লাভ কী হলো।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা এবার পদক পেয়েছেন তাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ আমলের প্রভাবশালী বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের আস্থাভাজন ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের কেউ ‘জেলা কোটায়’ আবার কেউ ‘বিএনপি পরিবারের সদস্য’ কোটায় দাপটের সঙ্গে পুলিশে বহাল তবিয়তে আছেন। কেউ আবার পুলিশের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের জেরে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন।’
