নতুন সরকারের সাফল্যের জন্যই স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রয়োজন। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা টিকে থাকা ও বিকাশের জন্য শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং আর্থিক ও রাজনৈতিক উভয় চাপ প্রতিরোধ করা অপরিহার্য। রাজধানীতে সাংবাদিকতাবিষয়ক এক সম্মেলনে বক্তারা এমন মন্তব্য করেছেন। ‘বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা: বর্তমান অবস্থা, প্রতিবন্ধকতা ও ভবিষ্যৎ পথ’ শীর্ষক বাংলাদেশ সাংবাদিকতা সম্মেলনটি শুক্রবার (৮ মে) রাজধানীর র্যাডিসন ব্ল ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে শুরু হয়েছে। দুই দিনব্যাপি এ সম্মেলনের আয়োজক মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)। দেশ-বিদেশের পাঁচ শতাধিক সাংবাদিক, সম্পাদক, গবেষক এবং সাংবাদিকতার শিক্ষক এ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যে দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, অতীতের সরকারগুলোর যে দূর্বলতা, তাদের পতন, তার অন্যতম কারণ ছিল তারা স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিকশিত হতে দেয়নি। নতুন সরকার অতীত থেকে শিখবে, এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, নতুন সরকার এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শিখবে যে, তাদের প্রয়োজনেই স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রয়োজন। তাদের সাফল্যের জন্যই স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রয়োজন।
মাহফুজ আনাম বলেন, সাংবাদিকরা যেন নৈতিকতার ভিত্তিতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করেন; প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়বদ্ধ রাখে। জনগণের অর্থ খরচের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকার ও স্বাধীন সাংবাদিকতার মধ্যে এই সম্পর্কটা খুব জরুরি।
মাহফুজ আনাম বলেন, স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য একটি শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান পূর্বশর্ত। তার মতে, ‘একজন সম্পাদক মালিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা হতে পারেন না। পত্রিকা প্রকাশনায় মালিকদের ভূমিকা থাকলেও, মালিকের ভূমিকা ও সম্পাদকের ভূমিকার মধ্যে পার্থক্য থাকতে হবে।’
গণমাধ্যমের রাজনীতিকরণের কারণে বাংলাদেশে সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানটি বিকশিত হয়নি, এমনটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন এবং বড় বড় বিজ্ঞাপন দেন। এসব চাপ যিনি সামাল দিয়ে সঠিক সাংবাদিকতায় নেতৃত্ব দিতে পারবেন, তিনি হলেন সম্পাদক। সংবাদপত্র শিল্পে জবাবদিহিতা আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সম্পাদক পরিষদ দুটি পৃথক আচরণবিধি প্রণয়ন করছে- একটি সম্পাদকদের জন্য এবং অন্যটি গণমাধ্যম মালিকদের জন্য।
২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে বাংলাদেশে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপর যেভাবে প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকার অভাব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে হামলার আগাম ঘোষণা থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এসব হামলার পর সমাজের কিছু পরিচিত ব্যক্তি, আইনজীবী, ‘অধিকারকর্মী’ এবং গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ ঘটনাগুলোকে ‘উপভোগ’ করেছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও ঝুঁকি মোকাবেলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন-এর সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেন, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এখন অনুসন্ধানের বদলে মুনাফার দিকে ঝুঁকছে। এই প্রবণতা সাংবাদিকতার অস্তিত্বকে বিপন্ন করবে।
একটি গণমাধ্যমের টিকে থাকা সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠানটির সম্পাদকীয় টিমের স্বায়ত্তশাসন ও সততার ওপর নির্ভর করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভালো সাংবাদিকতার করার জন্য সম্পাদক ও তার টিমের ওপর প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের আস্থা থাকা দরকার। তা না হলে কোনো গণমাধ্যমের উন্নতি করার কোনো উপায় থাকে না।
বেসরকারি ও রাষ্ট্রীয় খাতের দুর্নীতি উন্মোচনকে ‘এক ধরনের জনসেবা’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, স্বআরোপিত সেন্সরশিপ কোনো কর্তৃপক্ষের আরোপ করা সেন্সরশিপের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর; কারণ গণমাধ্যমগুলো প্রকাশ্যে স্বআরোপিত সেন্সরশিপের কথা স্বীকার করতে পারে না।
কানাডার টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক বলেন, গভীর বিশ্লেষণ ও মন্তব্যের পাশাপাশি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এমন উপাদান, যা একটি সংবাদমাধ্যমকে অন্যটি থেকে আলাদা করে। এ ধরনের প্রতিবেদন করতে শুধু সাংবাদিকের সাহস নয়, সম্পাদক, মালিক ও আইনজীবীর অটল সমর্থন দরকার। কারণ বড় অনুসন্ধান একার কাজ নয়।
টিআইবির পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানগুলোকে কোলাহল দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া সেন্সরশিপের একটি আধুনিক কৌশল।
সমকাল সম্পাদক শাহেদ মোহাম্মদ আলী, বাংলাদেশে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস, ইউনেস্কো প্রতিনিধি সুসান ভায়েজ, গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের (জিআইজেএন) নির্বাহী পরিচালক এমিলিয়া দিয়াজ-স্ট্রাক, যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ, এমআরডিআই নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান ও হেড অব ক্যাপাসিটি বিল্ডিং বদরুদ্দোজা বাবু, দ্য ডেইলি স্টারের সিনিয়র রিপোর্টার জায়মা ইসলামসহ দেশ-বিদেশের সংশ্লিষ্ট খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আলোচনায় অংশ নেন।
প্রথম আলোর কনসালটেন্ট কুররাতুল আইন তাহমিনা, বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার ও দ্য ডেইলি স্টারের ডিজিটাল এডিটর তানিম আহমেদ প্রথম দিনের বিভিন্ন অধিবেশন সঞ্চালনা করেন।
