খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব বড়দিনকে সামনে রেখে মালয়েশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আবহ। রাজধানী কুয়ালালামপুর ছাড়াও পেনাং, জোহর বাহরু, মেলাকা ও সাবাহ–সারাওয়াকের বিভিন্ন শহরে আলোকসজ্জা ও শীতকালীন থিমের বর্ণিল সাজে মুখর হয়ে উঠেছে শপিং মল, চার্চ, হোটেল ও জনসমাগমস্থল।
কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাং, সুরিয়া কেএলসিসি, প্যাভিলিয়ন কুয়ালালামপুর ও মিড ভ্যালি মেগামলের মতো এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই আলো–ছায়ার নান্দনিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। পরিবার–পরিজন নিয়ে ছবি তোলা, উপহার কেনাকাটা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপভোগ করতে ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদেশি পর্যটকেরা। বড়দিন উপলক্ষে শপিং মলগুলোতে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ ছাড়, যা ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ফেডারেল রাজধানীতে সাজসজ্জা ব্যবসায়ী ডট হ্লেই সুং (৪২) জানান, এবার তাঁরা বড়দিন পালন করবেন সাদামাটাভাবে। তিনি বলেন, স্বামী, কন্যা ও শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে আমরা চার্চে প্রার্থনায় অংশ নেব। ব্যস্ততার মধ্যেও মেয়ের জন্য একটি উপহার কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
মেলাকার উজং পাসিরের পর্তুগিজ সেটেলমেন্টে বড়দিনের বিশেষ সাজসজ্জা ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে। মেলাকা পর্তুগিজ হেরিটেজ অ্যান্ড ক্র্যাফটসের চেয়ারম্যান মারিনা লিন্ডা ড্যাঙ্কার জানান, ‘ক্রিস্তাং’ সম্প্রদায়ের সদস্যরা গত মাস থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১১৮টি বাড়িতে বসবাসরত প্রায় ১,৪০০ মানুষ বড়দিনের গাছ, রঙিন আলো, রেইনডিয়ার ও ধর্মীয় প্রতীকে ঘর সাজান। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী এসেছেন, আর বড়দিনের আগের রাতে ভিড় আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
পেনাংয়ের বুকিত মেরতাজাম ও সেবেরাং জায়া এলাকায় শপিং মল ও সুবিধা দোকানগুলোতে বড়দিনের কেনাকাটায় ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে মানুষজন দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রী, সাজসজ্জা ও উপহার কিনতে ব্যস্ত। শীতকালীন থিমে সাজানো মলগুলো শিশুদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
জোহর বাহরুতেও শপিং মল ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। খাবার, উপহার ও বড়দিনের সামগ্রীর চাহিদা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। কর্পোরেট নির্বাহী ভি. নিতিয়া (৪২) বলেন, আমাদের আনন্দটা বেশি খরচে নয়; ঘরে রান্না করা খাবার আর একসঙ্গে সময় কাটানোর মধ্যেই। তিনি জানান, ‘ক্রিসমাস ২০২৫ ফেস্টিভ সিজন ম্যাক্সিমাম প্রাইস স্কিম’-এর কারণে কিছু পণ্যের দাম তুলনামূলক কম ছিল।
এদিকে সিঙ্গাপুর থেকে আসা পর্যটক ড্যানিয়েল ফুন (৩৫) বলেন, বড়দিনের কেনাকাটার জন্য জোহর বাহরু এখনো সাশ্রয়ী গন্তব্য। তাঁর ভাষায়, এক জায়গাতেই সব পাওয়া যায়, দামও ভালো। উৎসবের পরিবেশ কেনাকাটাকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।
অন্যদিকে, হালাল-সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে বড়দিনসহ অমুসলিম ধর্মীয় উৎসবের সাজসজ্জা বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী দাতুক জুলকিফলি হাসান। তিনি জানান, ২০২৩ সালে জাকিমের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ ধরনের সাজসজ্জা নিষিদ্ধ নয়, তবে কিছু শর্ত মানতে হবে। যেমন,সাজসজ্জা স্থায়ী করা যাবে না, ধর্মীয় উপাসনাসংক্রান্ত সামগ্রী ব্যবহার করা যাবে না এবং হালাল সনদ বা লোগোর সঙ্গে একসঙ্গে প্রদর্শন করা যাবে না।
মন্ত্রী জুলকিফলি বলেন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান মালয়েশিয়ার বহুজাতিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। হালাল মানদণ্ড বজায় রাখার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
সব মিলিয়ে, মালয়েশিয়ায় এবারের বড়দিন উদযাপিত হচ্ছে পারিবারিক সম্প্রীতি, সরল আনন্দ ও পারস্পরিক সহাবস্থানের চেতনায়—যেখানে উৎসবের আলোয় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে দেশের বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়।
