প্রাচীন সভ্যতা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক মিশর-এ বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে উৎসাহ উদ্দীপনায় উদযাপিত হলো হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী উৎসব শাম-ইল নাসিম। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে দিনটি পরিণত হয় এক সর্বজনীন মিলন মেলায়।ঐতিহাসিকদের মতে, শাম-ইল নাসিম-এর সূচনা প্রায় ৪,৫০০ বছরেরও বেশি আগে ফেরাউন যুগে। প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাসে এটি ছিল প্রকৃতির পুনর্জাগরণ, নতুন জীবনের সূচনা এবং কৃষি মৌসুমের প্রতীকী উদযাপন। সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবর্তন এলেও উৎসবটির মৌলিক ঐতিহ্য আজও অটুট রয়েছে।
বর্তমানে শাম-ইল নাসিম পালিত হয় কপটিক ইস্টার-এর পরদিন। যদিও এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার নির্ভর নয়, তবুও মুসলিম, খ্রিস্টান সহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে এদিনের আনন্দ ভাগাভাগি করেন—যা মিশরের সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উৎসবের দিন ভোর থেকেই রাজধানী কায়রো-সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে যান খোলা প্রাকৃতিক পরিবেশে। নগরীর পার্ক, উদ্যান ও নীলনদ-এর তীর ভরে ওঠে উৎসবমুখর জনসমাগমে। অনেকে আবার ঐতিহাসিক গিজার পিরামিড এলাকা কিংবা নদীর পাড়ে বসন্তের দিনটি উদযাপন করেন।
এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘ফেসিখ’ (লবণাক্ত ও সংরক্ষিত মাছ), ‘রিঙ্গা’ (ধূমায়িত হেরিং মাছ), সবুজ পেঁয়াজ, লেটুস এবং আঁকায়িত রঙিন সিদ্ধ ডিম। প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী, এসব খাবার সুস্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে রঙিন ডিম নতুন জীবনের সূচনা ও পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয়।
সরকারি ছুটির কারণে এদিন নগর জীবনের ব্যস্ততা অনেকটাই কমে আসে, সৃষ্টি হয় এক স্বতন্ত্র উৎসবমুখর আবহ। শিশুদের হাসি, পারিবারিক আড্ডা, লোকজ সংগীত, পিকনিক এবং খোলা আকাশের নিচে সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও স্মরণীয়।
আধুনিকতার চাপে যখন অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন শাম-ইল নাসিম মিশরীয়দের মনে করিয়ে দেয় তাদের শিকড়, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কথা। এটি কেবল একটি উৎসব নয়—বরং একটি জীবন্ত ঐতিহ্য, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান থেকে জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে দৃঢ় করে তুলছে। সব মিলিয়ে, বসন্তের এই প্রাণবন্ত উৎসব মিশরের ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও আনন্দের এক অনন্য প্রতীক—যা আজও একই উচ্ছ্বাসে উদযাপিত হয়ে আসছে।
