কওমিপন্থি সাত ইসলামী দলের ঐক্য প্রক্রিয়ায় এবার ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের’ পালা। আগামী রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরে সাত দলের ঐক্যের সমন্বিত রূপরেখা নিয়ে চূড়ান্ত বৈঠক হবে। সকাল ১০টায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে বৈঠকে সাত দলের দেওয়া পৃথক প্রস্তাব সমন্বয় করে তৈরি রূপরেখা উপস্থাপন করা হবে। এতে সাত দলের পাঁচজন করে মোট ৩৫ প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন। তাদের মতামতের ভিত্তিতে ঐকমত্যের মাধ্যমে ঐক্যের রূপরেখা বা ফর্মুলা চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।
সাত দলের ঐক্য প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) কালবেলার সঙ্গে আলাপকালে হেফাজতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশিরউল্লাহ এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘সাত দলের ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে হেফাজতের উদ্যোগে গঠিত উপকমিটির শেষ বৈঠক আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর রোববার সকালে জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর এদিন সকাল ১০টায় আমরা হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে বৈঠক করব। সাত দলের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাবগুলো সমন্বয় করে যে রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে, সেটি আমিরের সামনে উপস্থাপন করা হবে।’
মুফতি বশিরউল্লাহ বলেন, ‘সাত দলের প্রতিনিধিদেরও সেখানে ডাকা হয়েছে। প্রতিটি দল থেকে পাঁচজন করে মোট ৩৫ জন প্রতিনিধি থাকবেন। আমির সাহেব সমন্বিত রূপরেখাটি দেখার পর সাত দলের প্রতিনিধিদের সামনে তা উপস্থাপন করা হবে। সবার মতামতের ভিত্তিতে ঐকমত্যের মাধ্যমে আমির সাহেব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।’
এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর কালবেলার প্রতিবেদনে সাত দলের ঐক্য প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছিল। তখন হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে গঠিত উপকমিটি সাত দলের পৃথক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করে একটি ‘সমন্বিত রূপরেখা’ তৈরি করেছিল। তবে সেটি তখনও সাত দলের নেতাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। এবার সেই রূপরেখাই সাত দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাত দলের ঐক্য প্রক্রিয়ায় আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে—ঐক্যে থাকা দলগুলো একই সময়ে অন্য কোনো রাজনৈতিক জোটে থাকতে পারবে কি না। এ বিষয়ে সাত দলের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
মুফতি বশিরউল্লাহ কালবেলাকে বলেন, ‘সব দলেরই এ বিষয়ে আলাদা আলাদা প্রস্তাব আছে। বেশিভাগ দলই একই সময়ে অন্য কোনো জোটে টে না থাকার পক্ষে মত দিয়েছে। তবে হেফাজতের এ বিষয়ে ব্যক্তিগত কোনো পছন্দ নেই। আমির সাহেব সবার সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেবেন।’
একই সময়ে অন্য জোটে থাকা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কীভাবে হবে—এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যদি এ বিষয়ে মতভেদ থেকেই যায়, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। তবে আমির সাহেব সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত ফয়সালা দেবেন।’
হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক আরও বলেন, ‘২৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকই সাত দলের ঐক্যের বিষয়ে শেষ বৈঠক। ওই বৈঠকেই ঐক্যের ফর্মুলা বা রূপরেখা চূড়ান্ত হবে।’
এদিকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরেছেন। হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী কালবেলাকে এ তথ্য জানান। চিকিৎসার জন্য তিনি সেখানে অবস্থান করছিলেন।
কওমিপন্থি সাত ইসলামী দলের ঐক্য প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় গত ১৬ জুলাই। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে সাত দলের নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে পথ চলার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হন দলগুলোর নেতারা।
পরে সাত দলকে তাদের প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়। প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের জন্য হেফাজতের উদ্যোগে সাত সদস্যের একটি উপকমিটি গঠন করা হয়। গত ১ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী মাদ্রাসায় ওই উপকমিটির বৈঠকে সাত দলের পৃথক প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা করে একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরির কাজ শেষ করা হয়।
সাত দলের প্রস্তাবে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বড় ধরনের বিরোধ না থাকলেও ঐক্যের ধরন, রাজনৈতিক কর্মকৌশল ও সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে। কালবেলার হাতে আসা সাত দলের প্রস্তাবনাগুলোর কয়েকটি কপি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে সাত দলের ঐক্য এবং নির্বাচনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমন্বয়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রতিটি দলের নিজস্ব রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সিদ্ধান্তের অধিকার বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। অন্যদিকে খেলাফত মজলিস নতুন ঐক্যে যুক্ত দলগুলোর অন্য কোনো জোটে না থাকার পক্ষে মত দিয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি সমমনা দলগুলোর ঐক্যের পাশাপাশি মাঠে সক্রিয় থাকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন কওমি স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে হেফাজতের তত্ত্বাবধানে ঐক্যের প্রস্তাব দিয়েছে। ইসলামী ঐক্যজোট আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদাকে ঐক্যের ভিত্তি করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
সাত দলের ঐক্য প্রক্রিয়ায় রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি।
