স্বজনহীন ঈদ, থমকে গেছে ফ্রান্স প্রবাসীদের দেশে ফেরার স্বপ্ন

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬, ১০:১৪ পিএম

প্যারিস থেকে ঢাকা। দূরত্ব শুধু হাজার কিলোমিটারের নয়, এবার সেই দূরত্ব আরও বেড়ে গেছে আকাশছোঁয়া বিমানভাড়ায়। বছরের পর বছর পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকা প্রবাসীদের কাছে ঈদ মানেই ছিল দেশে ফেরার এক টুকরো স্বস্তি। কিন্তু টিকেটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের সেই স্বপ্ন এখন অনেকের কাছেই অধরা হয়ে পড়েছে।

ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের বড় একটি অংশ জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় এবার বিমানভাড়া কয়েকগুণ বেড়েছে। ২০২৫ সালে যেখানে প্যারিস-ঢাকা রিটার্ন টিকেট ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যেত, সেখানে বর্তমানে একই টিকেটের মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকায়। কিছু ক্ষেত্রে ভাড়া আরও বেশি চাওয়া হচ্ছে।

প্রবাসীদের অভিযোগ, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, এভিয়েশন ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধি এবং ঈদকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় ব্যবহৃত জ্বালানির দামও গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মার্চ মাসে প্রতি লিটার জ্বালানির মূল্য ছিল ১ দশমিক ৩২ ডলার, যা এপ্রিল মাসে বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৪৮ ডলারে। যদিও বর্তমানে সরাসরি ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ নেই, তবুও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে। কিছু রুট সীমিত হওয়া, ফ্লাইট পুনর্বিন্যাস এবং অপারেশন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যে বিমানভাড়া বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশগামী যাত্রীদের ওপরও।

প্যারিসে বসবাসরত অনেক প্রবাসী বলছেন, বছরের অধিকাংশ সময় পরিবার ছাড়া কাটালেও ঈদের সময়টুকু ছিল সবচেয়ে বড় আবেগ। কিন্তু এবার সেই ঈদও কাটবে প্রবাসে, মোবাইল ফোনের পর্দায় পরিবারকে দেখেই।

প্যারিসপ্রবাসী মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, সারা বছর মেয়েটা শুধু জিজ্ঞেস করে, বাবা কবে আসবা? এবার টিকেটের দাম শুনে আর সাহস পাইনি। দুই লাখ টাকা দিয়ে দেশে গেলে পরিবারের জন্য কী নিয়ে যাব?

আরেক প্রবাসী আমিন আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, প্রবাস জীবন এমনিতেই নিঃসঙ্গ। ঈদের দিন সকালে মায়ের হাতের সেমাই, বাবার সঙ্গে নামাজ, ভাইদের সঙ্গে কোলাকুলি, এসব এখন শুধু স্মৃতি। শুধু বিমানভাড়া নয়, ইউরোপে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে কয়েকগুণ। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সঞ্চয় কমে গেছে প্রবাসীদের। ফলে দেশে যাওয়া এখন অনেকের কাছেই বিলাসিতার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রামের বাসিন্দা ও ফ্রান্সপ্রবাসী ট্রাভেল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এনাম জানান, ২০২৫ সালে বাংলাদেশগামী টিকেট ৮০০ ইউরোতে পাওয়া যেত, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার টাকা। বর্তমানে একই টিকেটের দাম ১ হাজার ৪০০ ইউরো ছাড়িয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার বেশি।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে কিছু এয়ারলাইনস তাদের নির্ধারিত রুটে সীমিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বিশেষ করে কুয়েত এয়ারওয়েজ ও এমিরেটসের কিছু ফ্লাইট সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ায় চাপ বেড়েছে অন্যান্য এয়ারলাইনসের ওপর। ফলে সৌদি এয়ারলাইনসসহ চালু থাকা ফ্লাইটগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ তৈরি হয়েছে।

ফ্রান্সের আরেক ট্রাভেল ব্যবসায়ী ও মন্ডিয়াল ট্রাভেলের স্বত্বাধিকারী ইব্রাহিম হাসান বলেন, অনেকে টিকেট করতে এসে উচ্চমূল্য ও সময়মতো সিডিউল না পাওয়ার কারণে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ ঈদের ছুটি বাতিল করছেন, আবার কেউ সফরের পরিকল্পনাই বাদ দিচ্ছেন।

তিনি আরও জানান, জুন, জুলাই ও আগস্ট সাধারণত ইউরোপে ভ্রমণের ব্যস্ত মৌসুম। কিন্তু এবার অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে যাত্রী কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে ট্রাভেল ব্যবসায়ও ধস নেমেছে। অনেক এজেন্সির টিকেট বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন প্রবাসীরা। কেউ লিখছেন, ‘ঈদ আসছে, কিন্তু মন দেশে যেতে পারছে না।’ আবার কেউ বলছেন, ‘প্রবাসের সবচেয়ে কষ্টের ঈদ সেই ঈদ, যেদিন সন্তান বাবাকে মোবাইলের স্ক্রিনে দেখে সালাম করে।’

তবুও থেমে নেই ভালোবাসা। দূর প্রবাসে থেকেও অনেকে পরিবারের জন্য নতুন জামা পাঠাচ্ছেন, কোরবানির টাকা পাঠাচ্ছেন, ভিডিও কলে সন্তানের হাসি দেখেই শান্তি খুঁজছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আকাশে যত বাড়ছে টিকেটের দাম, ততই মলিন হয়ে যাচ্ছে হাজারো প্রবাসী পরিবারের ঈদের আনন্দ।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন