জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম) প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড মাইগ্রেশন রিপোর্ট-২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশের তালিকায় ৮ম অবস্থানে আছে। গত ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী অবস্থান ছিল ৭ম, ২০১৫ সালে ৯ম এবং ২০১০ এ ১০ ম অবস্থায় ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমবর্ধমান এবং নতুন সরকারের বিশদ পরিকল্পনা করার ফলে রেমিটেন্স আহরণে উল্মফ ধারা অব্যাহত রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন। এজন্য সরকারকে শ্রমবাজার বহুমুখী করণ, দক্ষতার উন্নয়ন, উত্তম রিক্রুটমেন্ট চর্চা এবং দুষ্টের দমনের উপর গুরুত্বারোপ করার অনুরোধ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪ সালে ২১.৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশে প্রেরণ করেছে। ২০১০ থেকে ২০২৪ প্রতিবেদনগুলোতে বরাবরের মতো শীর্ষে রয়েছে ভারত। দেশটি গত বছর মোট ১৩৭.৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। একই সঙ্গে ভারতই একমাত্র দেশ হিসেবে বার্ষিক রেমিট্যান্স প্রবাহে ১০০ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত কয়েক বছরে ভারতের রেমিট্যান্স প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২০ সালে যেখানে দেশটির রেমিট্যান্স আয় ছিল প্রায় ৮৩.১৫ বিলিয়ন ডলার, সেখানে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ১৩৭.৬৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত ও অধ্যয়নরত ভারতীয়দের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ কোটিরওবেশি বাংলাদেশী অবস্থান করার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের রেমিটেন্স আহরণর পরিমাণ হতাশাজনক। রেমিটেন্স প্রেরণের তালিকায় পাকিস্তান রয়েছে বাংলাদেশের উপরে ৫ম অবস্থানে। পাকিস্তান ২০১৫ সালে এ তালিকায় ৭ম অবস্থান দখল করে বহাল রেখেছে। ২০২৪ সালে পাকিস্তানি নাগরিকরা দেশে ২৮.৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রেরণ করেছে যা দক্ষিণ এশিয়ায় ২য়। ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকের নিজ দেশে নিয়মিত অর্থ পাঠানো কারণে ঐ দুটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পরিমাণ বেড়েছে। এরফলে দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্বের শীর্ষ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশের তালিকায় ভারতের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মেক্্রিকো, যারা ২০২৪ সালে প্রায় ৬৭.৬৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে ফিলিপাইন, তাদের আয় ৪০.২৮ বিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে ফ্রান্স, পাকিস্তান, চিন, ইজিপ্ট, বাংলাদেশ, গোয়াতেমেলা ও নাইজেরিয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অষ্টম অবস্থান নিঃসন্দেহে ইতিবাচক হলেও দেশটি এখনো শীর্ষ পাঁচে প্রবেশ করতে পারেনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে। সবচেয়ে বড় কারণ হলো বিশ্বের প্রধান প্রধান অর্থনীতিতে কর্মী , প্রোফেশনাল এবং বিশেষজ্ঞ প্রেরণ করতে না পারা। বাংলাদেশ শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্য ও পরে মালয়েশিয়া নির্ভর হয়ে আছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রবাসী কর্মী মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নির্মাণ, কৃষি, পরিচ্ছন্নতা ও স্বল্প মজুরির খাতে কাজ করেন। ফলে তাদের আয় তুলনামূলক কম, এবং দেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণও সীমিত থাকে। আবার লেখা পড়া না জানা এবং লেখা পড়ার মানের ঘাটতিকে সামনে রেখে অনেক দেশ অদক্ষ ও স্বল্প বেতনের কর্মীর উৎস দেশ হিসেবে বাংলাদেশকেই বেছে নিয়ে থাকে। দেখা গেছে , অনেক দেশ ১৪০ কোটির দেশ ভারত থেকে সাধারণ কর্মী নিয়োগ করে না, বরং নির্দিষ্ট কিছু পেশার জনশক্তি নিয়োগ করে।
দেশটির বিপুলসংখ্যক তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও শিক্ষার্থী উন্নত দেশগুলোতে উচ্চ বেতনে কাজ করছেন। ফলে একজন ভারতীয় প্রবাসী গড়ে একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ দেশে পাঠাতে সক্ষম হন।
এছাড়া বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা থাকায় প্রকৃত রেমিট্যান্সের একটি অংশ সরকারি হিসাবে যুক্ত হয় না বলে অর্থনীতিবিদ বলে থাকেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ যদি নতুন নতুন শ্রম বাজার, দক্ষতার উন্নয়ন এবং কর্মী প্রেরণ প্রক্রিয়া সহজ, সুলভ ও হয়রানিমুক্ত করতে না পারে তাহলে নিয়োগকর্তারা কর্মী নিয়োগের উৎসাহ হারিয়ে ফেলে অন্য দেশে চলে যাবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রধান কর্মী নিয়োগকারী দেশের ক্ষেত্রে এ প্রবণতা দেখা গেছে।
তবে, আশার কথা, নতুন তারেক রহমানের সরকার ৫ বছরে ১ কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, অভিবাসনে সুশাসন, দক্ষতার উন্নয়ন এবং প্রবাসী কার্ড প্রদান ও প্রবাসীদের সেবা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে যা জাতিকে আশান্বিত করে তুলেছে।
তবে আইওএম সতর্ক করে বলেছে, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে অনেক অভিবাসী ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাত্রা করতে বাধ্য হন। তাই বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সংস্থাটি মনে করে, অভিবাসন শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানবিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
