দেশের সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের জন্য সুখবর আসছে আগামী ১ জুলাই থেকে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের পাশাপাশি এবার অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন সুবিধা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে যারা বর্তমানে কম টাকা পেনশন পাচ্ছেন, তাদের আর্থিক কষ্ট লাঘব করতে পেনশনের হার সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় গঠিত বিশেষ কমিটি আগামী ২১ মে এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত সুপারিশ চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে।
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, পেনশনভোগীদের পেনশনের হার সর্বোচ্চ শতভাগের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, যারা বর্তমানে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের পেনশনের পরিমাণ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অন্যদিকে, যারা মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশন পান, তাদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার হতে পারে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত। এছাড়া, মাসে ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনভোগীদের সুবিধা ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই সুবিধাজনক পরিবর্তনগুলোর কতটুকু কার্যকর করা সম্ভব হবে, তা চূড়ান্ত করতে এখন শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে।
এদিকে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে নবম জাতীয় পে-স্কেল একবারে নয়, বরং তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে শতভাগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং এর জন্য আসন্ন বাজেটে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। তবে রাজস্ব আহরণের বর্তমান পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা মাথায় রেখে সব সুবিধা একযোগে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত কমিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম দুই অর্থবছরে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন (বেসিক) ৫০ শতাংশ করে মোট ১০০ শতাংশ সমন্বয় করা হবে। অর্থাৎ, আগামী ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া প্রথম ধাপে কর্মচারীরা তাদের বিদ্যমান মূল বেতনের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ সমন্বিত বেতন পাবেন এবং পরবর্তী অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ যুক্ত হবে। তবে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, ঝুঁকি ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা প্রথম দুই বছর আগের মতোই বহাল থাকবে। এই আনুষঙ্গিক সুবিধা ও বাড়তি ভাতাগুলো পুরোপুরি কার্যকর করা হবে তৃতীয় বছর অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে।
অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সরকারের এই ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির কৌশলকে যৌক্তিক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, বিগত কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে, তাই পে-স্কেল দেওয়া জরুরি ছিল। তবে একবারে পুরো সুবিধা দিলে সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হতো। পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজও এই তিন ধাপের বাস্তবায়নকে একটি বিচক্ষণ ও কৌশলী সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই নতুন পে-স্কেলের আওতায় শুধু প্রশাসন ক্যাডার নয়- শিক্ষক, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, বিচার বিভাগসহ সব স্তরের সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যকার বিদ্যমান বৈষম্য কমিয়ে আনার সুপারিশ করছে কমিটি। বাস্তবায়ন কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার পর তা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে এবং সেখান থেকে সবুজ সংকেত পেলেই অর্থ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
