ক্যারিয়ারের শেষ বেলায় এসে একটা বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে পারলে হয়তো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বর্ণিল ফুটবল ক্যারিয়ারে এক জাদুকরি পূর্ণতা আসতো। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে স্পেনের কাছে হেরে পর্তুগালের বিদায়ের পর সেই স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেল। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে স্প্যানিশ বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর নাটকীয় গোলে ১-০ ব্যবধানে হেরে মাঠ ছাড়তে হয় পর্তুগিজদের।
৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা অশ্রুসিক্ত চোখে যখন শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন তার নামের পাশে জ্বলজ্বল করছিল দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের জন্য করা সব সাফল্য। একটি মাত্র ট্রফি না পাওয়ার আফসোস কোনোভাবেই পর্তুগিজ ফুটবলে তার এই বিশাল অবদানকে আড়াল করতে পারবে না।
২০০৩ সালে জাতীয় দলে রোনালদোর অভিষেকের আগে পর্তুগাল ফুটবলের ইতিহাস ছিল একেবারেই সাধারণ। বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের স্বাদ তখনো পায়নি তারা, কেবল মাঝেমধ্যে কিছু ঝলক দেখানোই ছিল তাদের দৌড়। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান লাভ এবং ইউরো ২০০০-এর সেমিফাইনালে ওঠাই ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন। দলে প্রতিভাবান খেলোয়াড় থাকলেও বড় মঞ্চে ধারাবাহিকভাবে নিজেদের মেলে ধরার মতো মানসিকতার অভাব ছিল তাদের। ঠিক তখনই পর্তুগিজ ফুটবলের ত্রাতা হয়ে আগমন ঘটে রোনালদোর, যিনি আগামী দুই দশকে দলটিকে প্রতিভাবান বহিরাগত থেকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রধান পরাশক্তিতে রূপান্তর করেন।
রোনালদোর হাত ধরে শুরু হয় পর্তুগিজ ফুটবলের সবচেয়ে সফল ও সোনালি অধ্যায়। ঘরের মাঠে ২০০৪ সালের ইউরো ফাইনালে গ্রিসের কাছে হেরে হৃদয় ভাঙলেও সেটি ছিল এক নতুন যুগের সূচনা মাত্র। এরপর ২০০৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল এবং অবশেষে ২০১৬ সালে ফ্রান্সকে তাদেরই মাটিতে হারিয়ে প্রথম বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি হিসেবে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে পর্তুগাল। সাফল্যের এই ধারা এখানেই থেমে থাকেনি। ২০১৮-১৯ মৌসুমে উদ্বোধনী উয়েফা নেশনস লিগ জয়ের পর ২০২৫ সালেও তারা এই শিরোপা পুনরায় ঘরে তোলে, যা দলটিকে বিশ্ব ফুটবলের এলিট শ্রেণিতে পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
দলীয় সাফল্যের বাইরে রোনালদোর ব্যক্তিগত অর্জনগুলো ফুটবল ইতিহাসের পাতায় রূপকথার মতো। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে পুরুষ ফুটবলারদের মধ্যে তিনি সর্বোচ্চ ১৪৬টি গোল এবং দেশের হয়ে রেকর্ড সর্বমোট ২৩৩টি ম্যাচ খেলে ক্যারিয়ার শেষ করলেন। উয়েফা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপেও তার আধিপত্য ছিল একচ্ছত্র; যেখানে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৪টি গোল, সর্বোচ্চ ৩০টি ম্যাচ এবং রেকর্ড ছয়টি ভিন্ন আসরে খেলার অনন্য কীর্তি গড়েছেন তিনি। এছাড়া ইউরো বাছাইপর্বে রেকর্ড ৪১টি গোল এবং বিশ্বের প্রথম পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে ভিন্ন ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার অবিস্মরণীয় নজির স্থাপন করেছেন সিআরসেভেন। তাই একটি সোনালি ট্রফি অধরা থাকলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদোর রেখে যাওয়া এই লিগ্যাসি চিরকাল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং অমর হয়ে থাকবে।
