১৭ লাখ টাকা দেনমোহর হয়ে গেল ৩ লাখ ৭০ হাজার! কাজি পলাতক

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৪ পিএম

লালমনিরহাটের পাটগ্রামে এক গৃহবধূর বিয়ের রেজিস্ট্রিতে নির্ধারিত ১৭ লাখ টাকা দেনমোহর কেটে তিন লাখ ৭০ হাজার টাকা করার অভিযোগ ওঠেছে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম পৌরসভার নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলীর বিরুদ্ধে। প্রায় ১৩ লাখ মোহরানা কমিয়ে দেওয়ার এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ওই কাজি বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। ওই গৃহবধূকে তার স্বামী তালাকের নোটিশ পাঠানোর পর বিষয়টি সামনে আসে।

এ ঘটনায় বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে পাটগ্রাম পৌরসভার মির্জারকোট এলাকায় আজাদ ও মামুন নামে কাজির দুই সহযোগীকে আটক করেছে স্থানীয় গ্রামবাসী। পরে স্থানীয়দের আপসনামায় (মুচলেকা) স্বাক্ষর নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তাদের।

আটক আজাদ লালমনিরহাট জেলা জামায়াতের সাবেক আমির আতাউর রহমানের ছোট ভাই এবং অপরজন একই এলাকার মামুন। আর অভিযুক্ত ইউনুস আলী পাটগ্রাম পৌরসভার নিকাহ রেজিস্টার।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা ইউনিয়নের দালালপাড়া গ্রামের শাহাজান আলীর ছেলে অহেদ আলী দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গত ২০২৫ সালে ১০ জানুয়ারি মির্জারকোট এলাকার দরিদ্র রিকশাচালক আশাদুল ইসলামের মেয়ে আরফিনা আক্তার মিমকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় ১৭ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে রেজিস্ট্রিসহ একটি নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের স্বাক্ষরিত চুক্তিনামাও তৈরি করে নেন গ্রামবাসী। 

বিয়ের পরে প্রথমবার অন্তঃসত্ত্বা হলে কৌশলে স্ত্রীর গর্ভপাত করান অহেদ আলী। দ্বিতীয় বার গর্ভবতী হলে একটি মেয়ে সন্তান জন্ম দেন আরফিনা আক্তার মিম। এরই মধ্যে অভিযুক্ত নিকাহ রেজিস্ট্রারকে ম্যানেজ করে দেনমোহর ১৭ লাখ টাকা থেকে কেটে কমিয়ে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা করেন অহেদ আলী। পরে ওই মোহরানার টাকা আদালতে প্রদান করে আরফিনা আক্তার মিমকে তালাক দেন। সেই তালাকের নোটিশ হাতে পেয়ে নির্বাক হয়ে পড়ে পরিবারটি।

ঘটনা শোনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে গ্রামবাসী। পরে গ্রামবাসীর মাধ্যমে বিয়ের নকল উঠানোর আবেদন করা হয়। নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলী কৌশলে তার দুই সহযোগী আজাদ ও মামুনকে নকল নিয়ে মেয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। বিয়ের নকল নিয়ে আসার পর গ্রামবাসী তাদেরকে আটকে রাখেন। খবর পেয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান কাজী ইউনুস আলী। এদিকে গ্রামবাসীর কাছে জিজ্ঞাসাবাদ কাজী ইউনুসের দেনমোহর জালিয়াতির বিষয়টি স্বীকার করেন আটক দুজন। পরে আপস মীমাংসার মুচলেকায় তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

গ্রামবাসীদের ওই আপস বৈঠকে কিছু টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে চান নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলীর প্রতিনিধি ও তার ভগ্নিপতি হাফিজুল ইসলাম। তবে সেই ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করে বৈঠক ত্যাগ করেন গ্রামবাসী ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার। বৈঠকের নেতৃত্ব দেন পাটগ্রাম পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তফা সানাউজ্জামান ওপেল ও পৌর জামায়াতের আমির সোহেল রানা।

স্থানীয়রা জানান, এর আগেও ২০১৮ সালে দেনমোহর জালিয়াতির দায়ে নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলী ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলো। অভিযুক্ত কাজী ইউনুস স্থানীয় একটি মাদরাসার অধ্যক্ষ। নিজে দ্বৈত পেশায় ব্যস্ত থাকায় ৫থেকে ৭জন সহযোগী দিয়ে বিবাহ সংক্রান্ত কার্যাদি সম্পন্ন করে আসছে তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শী শহিদুল ইসলাম বলেন, গ্রামবাসী সহযোগীদের আটক করলেও পরে আপস মীমাংসার স্বার্থে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিয়ের সময় ১৭ লাখ টাকা লেখা হলেও পরবর্তীতে নিকাহ রেজিস্ট্রারের নির্দেশে নকলে দেনমোহর ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা লেখা হয়েছে বলেও জনতার সামনে স্বীকার করেছেন আটক ব্যক্তিরা। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলেও তিনি জানান।

আটক সহযোগীদের একজন আজাদ বলেন, কাজী ইউনুস আলীর নির্দেশে মূল ভলিয়ম বই দেখে নকল তৈরি করে নিয়ে এসেছি। জালিয়াতি করলে কাজী ইউনুস আলী বলতে পারবেন। আমরা তার হয়ে লিখে দিয়েছি মাত্র।

ওই কাজীর আরেক সহযোগী হাফিজুল ইসলাম বলেন, কাজী ইউনুস আলীর ভলিয়ম বইয়ের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের রেজিস্ট্রির কাজ আমি করে থাকি। ১৭ লাখ টাকার দেনমোহরের বিয়ে রেজিস্ট্রির কাজটিও আমি করেছি। মূল ভলিয়মে দেনমোহর অংকে এবং কথায় লিখেছিলাম ১৭ লাখ টাকা। এ বিয়ে নিবন্ধন বাবদ কাজী ইউনুস আলী ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। দেনমোহর কমার ব্যাপারে মূল কাজী ইউনুস আলীই বলতে পারবেন। আটক ওই দুই সহযোগী এর কিছুই জানে না।

অভিযুক্ত পাটগ্রাম পৌরসভার নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজী ইউনুস আলীর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে কল দিলে বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

পাটগ্রাম পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তফা সানাউজ্জামান ওপেল বলেন, জনতার কাছে আটকরা জালিয়াতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে অভিযুক্ত কাজী ইউনুস আলী আত্মগোপনে থাকায় বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব হয়নি। এর আগেও তিহি দেনমোহর জালিয়াতির ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে। এছাড়া নানা নারী কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত ইউনুস আলী। এই কাজীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তিনি।

পাটগ্রাম থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, স্থানীয়দের করা মোবাইলে মোহরনা জালিয়াতি ও আটকদের বিষয়টি জেনেছি। তবে এ ঘটনায় এখনো থানায় লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর