স্কুলছাত্রী তাজমিন হত্যা: যে ছোট্ট ভুলে ধরা পড়েন ঘাতক সুমন

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৮ এএম

কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৫) ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর রহস্য উদ্ঘাটন করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মামলার একমাত্র আসামি সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়াকে (৩৫) চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নিজের কাছে কোনো মোবাইল ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইস না রেখেও শেষ পর্যন্ত একটি ছোট্ট ভুলে তিনি গোয়েন্দা পুলিশের জালে ধরা পড়লেন। সেই চাঞ্চল্যকর তথ্যই সামনে এসেছে।

পুলিশ জানায়, বুধবার গভীর রাতে তাজমিনকে (১৫) ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন সুমন। এরপর পাশের একটি মসজিদের পুকুরে গোসল করে চট্টগ্রামের দিকে চলে যান তিনি। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্তে নামে গোয়েন্দা পুলিশ। সুমনের সঙ্গে মোবাইল ফোন বা কোনো ডিজিটাল ডিভাইস না থাকায় তাকে শনাক্ত করে অবস্থান নিশ্চিত করতে কিছুটা বেগ পেতে হয় গোয়েন্দাদের।

পুলিশ জানায়, কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের শ্বশুরবাড়ির স্বজনদের জিজ্ঞাসাবাদে সুমনের এক ভাই চট্টগ্রামে থাকেন বলে জানতে পারেন গোয়েন্দারা। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাতে নিজস্ব গোয়েন্দা কৌশলে তারা নিশ্চিত হন, সুমন চট্টগ্রামের দিকে গেছেন। এরপরই চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয় গোয়েন্দা পুলিশের দল। সেখানে পৌঁছেও তার অবস্থান নিশ্চিত করতে সমস্যায় পড়েন তারা।

পরে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লালমাইয়ের জগতপুর এলাকার শ্বশুরবাড়ির এক আত্মীয়ের কাছে ফোন করেন সুমন। বিপদে পড়েছেন জানিয়ে বিকাশে ৫০০ টাকা পাঠাতে বলেন তিনি। চট্টগ্রাম নগরের অলংকার এলাকার এক ব্যক্তির মোবাইল ফোন ব্যবহার করে এ কল করেন সুমন। ওই ফোনকলের সূত্র ধরেই তার অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরের অলংকার এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

এর আগে সুমনের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনের মোবাইল নম্বরের ওপর নজরদারি বাড়ান গোয়েন্দারা। কে কখন তাদের ফোন করছেন তা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে তাজমিনকে ধর্ষণের চেষ্টা করলে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে অটোরিকশাটি ধানক্ষেতে কাত হয়ে পড়ে যায়। এ সময় পালানোর চেষ্টা করে তাজমিন। ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত পেরে উঠেনি সে। একটি ধানক্ষেতের আইলের পাশে তাকে ধরে ফেলেন সুমন। এরপর তাজমিনকে ধর্ষণ করে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন তিনি। মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার মাথার ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে রাখা হয় বলে জানায় পুলিশ। পরে অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলে ফেলে চলে যান সুমন। পড়ে যাওয়া সিএনজিটি একা সড়কে টেনে তোলা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। 

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের পাশ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ওই সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করে পুলিশ। অটোরিকশাটির নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে এর মালিক হিসেবে লালমাই উপজেলার আবুল হাসেমকে শনাক্ত করা হয়।

বৃহস্পতিবার রাতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, তার অটোরিকশাটি ভাড়ায় চালাতেন মো. সুমন মিয়া। সুমন লালমাই উপজেলার বাগমারা ইউনিয়নের জয়নগর এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন।

সুমন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা। কয়েক বছর আগে বিয়ে করে তিনি ঘরজামাই হিসেবে লালমাইয়ের জয়নগর গ্রামে বসবাস শুরু করেন। প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক বিরোধের জেরে তিনি শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে জানা গেছে। তার স্ত্রীর নাম জেসমিন। তাদের একটি ছেলে ও মেয়ে সন্তান রয়েছে। সুমন নেশাসক্ত ছিলেন। তার অত্যাচারে স্ত্রী বাপের বাড়িতে পৃথকভাবে থাকতেন।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন