অভিজাতদের সমঝোতার ঊর্ধ্বে সংবিধান সংস্কারে কেন সমাজতাত্ত্বিক বৈধতা অপরিহার্য?

মাহাদী-উল-মোর্শেদ
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম

ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রতিটি জাতিই এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে এসে দাঁড়ায় যেখানে একদিকে থাকে সাময়িক আইনি সংস্কারের প্রবণতা, আর অন্যদিকে থাকে মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনা আজ আর কেবল বড় বড় রাজনীতিবিদ বা আইনজীবীদের বৈঠকখানায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি সাধারণ মানুষের নাগরিক চেতনার মূলধারায় পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের এ সময়ে সংবিধান পুনর্গঠনের দাবিটি কেবল আইনি ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নাগরিক ভাবনার সঠিক চিত্র তুলে ধরতে একটি বিশেষ পরিমাপাত্মক গবেষণা পরিচালনা করা হয়, যার শিরোনাম: “Formation of Constitutional Reforms Commission: An Empirical Study”।

তবে মূল প্রশ্নটি থেকে যায়ঃ ক্ষমতার শীর্ষস্থানে থাকা রাজনৈতিক অভিজাতদের কোনো সাময়িক সমঝোতা নাকি সাধারণ নাগরিকদের বাস্তব চাহিদা কোনটি হবে এই সংস্কারের ভিত্তি? অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শীর্ষপর্যায়ের বন্ধ দরজার পেছনের সমঝোতা সাময়িক রাজনৈতিক স্বস্তি আনলেও তা দীর্ঘমেয়াদী শাসনতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

‘সমাজতাত্ত্বিক বৈধতা’ এবং পরিসংখ্যানের ভাষাঃ

আইন বা সংবিধান কেবল কাগজে-কলমে সুন্দর কিছু নীতি লিখে দিলেই কার্যকর হয় না। যতক্ষণ না দেশের সাধারণ নাগরিকরা অন্তর থেকে বিশ্বাস করেন যে এই আইন তাঁদের সুরক্ষার জন্য, যতক্ষণ না তারা এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নেন, ততক্ষণ তা টিকে থাকে না। আইনের ভাষায় একে বলা হয় ‘সমাজতাত্ত্বিক বৈধতা’। শীর্ষপর্যায়ের আইনি বৈধতা থাকলেই একটি শাসনতন্ত্র টেকসই হয় না, যদি না জনগণের মধ্যে তার সামাজিক ভিত্তি বা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। প্রমাণভিত্তিক এই গবেষণা “Formation of Constitutional Reforms Commission: An Empirical Study”-এর আওতায় ৪৪৮ জন নিবন্ধিত ভোটারের ওপর তথ্যসংগ্রহ ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়। পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত ফলাফল স্পষ্ট করে যে, সংবিধান সংস্কারের দাবি কেবল একটি সাময়িক রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি তথ্যের ভিত্তিতে প্রমাণিত জনদাবি।

মূল পরিসংখ্যানিক সূচক ও সহজ ব্যাখ্যাঃ

   জনদাবির গভীরতা
   পরিসংখ্যানিক মডেল (Multiple Linear Regression) বিশ্লেষণে দেখা যায়, নাগরিকদের সামাজিক ও জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্যসমূহ একত্রে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠনের দাবির ৪৫.৩% ভিন্নতা (R² = .453)** ব্যাখ্যা করে। সহজ ভাষায়, সাধারণ মানুষের ব্যাকগ্রাউন্ড, জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পেশাগত অবস্থান দেখলেই বোঝা যায় রাষ্ট্র সংস্কার তাঁদের কতটা মৌলিক ও দৈনন্দিন প্রয়োজন।

    পরিসংখ্যানিক নির্ভরযোগ্যতাঃ মডেলটির মান F(6, 441) = 60.83, p < .001, যা নির্দেশ করে গবেষণার ফলাফল কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়, বরং অত্যন্ত শক্ত বৈজ্ঞানিক ও উপাত্তভিত্তিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

উপাত্ত কী বলে? বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মতামত ও নাগরিক মনস্তত্ত্বঃ

পরিসংখ্যানের বিটা সহগ (β) এবং গড় নম্বর (M, ৫-পয়েন্ট স্কেলে) বিশ্লেষণ করলে সাধারণ পাঠকের কাছে প্রতিটি সামাজিক শ্রেণির নাগরিক মনস্তত্ত্ব আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠেঃ
শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রভাব (β = -.594): পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে শিক্ষাগত যোগ্যতা সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে দেখা গেছে। উচ্চশিক্ষিত নাগরিক, বিশেষ করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা সর্বোচ্চ M = 4.16 পয়েন্টে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় নীতি ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা যত বাড়ে, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠনের তাগিদ মানুষ তত বেশি অনুভব করে।

        আর্থ-সামাজিক স্থিতি ও ব্যবসায়ীদের আস্থা (β = .421): দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় গড় M = 4.00 পয়েন্ট সমর্থন দিয়ে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আইনি স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ আইনি কাঠামোর কোনো বিকল্প নেই।

        বয়স ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন (β = .377): বয়স্ক ও অভিজ্ঞ নাগরিকরা M = 3.85 সমর্থন নিয়ে শাসনব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী রূপান্তর চান, যাতে বারবার দেশে রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিরতা ফিরে না আসে। দশকের পর দশক ধরে চলা রাজনৈতিক সংঘাত প্রত্যক্ষ করার কারণে তাঁদের অভিজ্ঞতালব্ধ মতামত স্থায়ী সমাধানের দিকে নির্দেশ করে।

         ধর্মীয় ও সামাজিক সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা: জরিপে বৌদ্ধ সম্প্রদায় M = 4.00 এবং হিন্দু সম্প্রদায় M = 3.79 পয়েন্টে মৌলিক অধিকার সুসংহত করার দাবি জানিয়েছেন। সংবিধানে সর্বজনীন নাগরিক সুরক্ষা এবং অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তির অভাব যে তাঁদের প্রধান উদ্বেগের কারণ, তা এই উপাত্তে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নীতিগত বাস্তবায়নের রূপরেখা: প্রমাণের ভিত্তিতে ৩টি সুপারিশ

গবেষণালব্ধ উপাত্ত, নাগরিক মনস্তত্ত্ব এবং পরিসংখ্যানিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তিনটি প্রধান নীতিগত সুপারিশ তুলে ধরা হলোঃ

      ১. নির্বাহী ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক সীমা নির্ধারণঃ রাজনৈতিক প্রধানদের ক্ষমতার একচ্ছত্র বিস্তার ও অপব্যবহার রোধে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা নির্দিষ্ট করা, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ চালু করা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত জরুরি।

     ২. বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক পূর্ণ স্বাধীনতাঃ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ বিচারক নিয়োগ কমিশন গঠন এবং বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক।

     ৩. তৃণমূল নাগরিক অংশগ্রহণ ও জনমত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণঃ কেবল ঢাকার সুশীল সমাজ বা বড় দলের নেতাদের বদ্ধ দরজার আলোচনায় সমঝোতা না করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে 'টাউন হল' বৈঠকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মতামত জাতীয় সনদে যুক্ত করতে হবে। গণভোট বা জনমতের ভিত্তিতে সংবিধানের চূড়ান্ত অনুমোদন এর সমাজতাত্ত্বিক বৈধতাকে আরও শক্তিশালী করবে।

পরিশেষে, “Formation of Constitutional Reforms Commission: An Empirical Study” গবেষণার এই উপাত্ত ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রমাণ করে একতরফা বা সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত জনগণ দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণ করে না। রাজনৈতিক অভিজাতদের স্বৈরাচারী মনোভাব বা বন্ধ দরজার সমঝোতার দিন শেষ হয়ে এসেছে। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, উপাত্তের সঠিক মূল্যায়ন এবং জনমতের সমাজতাত্ত্বিক বৈধতার ওপর ভিত্তি করে সংবিধান পুনর্গঠন করা হলেই একটি বৈষম্যহীন, ইনক্লুসিভ ও স্বৈরাচারমুক্ত টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক : মাহাদী-উল-মোর্শেদ
গবেষক (সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্য) এবং পলিসি এনালিস্ট

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর