একটি স্বাধীন, নিরাপদ ও সুশাসিত রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ক্ষমতার সঠিক ভারসাম্য। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ক্ষমতার একক কেন্দ্রিকতা এবং দুর্বল শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে বারবার ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটেছে। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের হাতে ক্ষমতার আধিপত্য প্রকারান্তরে কর্তৃত্ববাদী শাসনের জন্ম দেয় যা আমাদের দেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা। এই সার্বিক পটভূমিতেই সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ওপর ভর করে সামনে এসেছে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা রূপরেখা। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং রাষ্ট্রকাঠামোকে নতুন করে সাজানোর এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
এই রূপরেখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব হলো সংবিধানে পরিবর্তন এনে বিধান করতে হবে যে, কোনো ব্যক্তি পরপর দুই মেয়াদের বেশি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। এই নিয়মের প্রধান লক্ষ্য হলো প্রাতিষ্ঠানিক একনায়কতন্ত্রের পথ বন্ধ করা, নির্বাহী প্রধানের অসীম ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা এবং রাজনীতিতে নতুন ও তরুণ নেতৃত্বের বিকাশের পথ উন্মুক্ত করা।
এই প্রস্তাবটি দেশের সাধারণ ভোটারদের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য, তা সরাসরি জানার জন্য ৪৪৮ জন নিবন্ধিত ভোটারের ওপর একটি ক্ষেত্রভিত্তিক জরিপ চালানো হয়। জরিপ থেকে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতার এক অত্যন্ত স্পষ্ট ছবি ফুটে উঠেছে। ফলাফলে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী ৪৪৮ জন ভোটারের মধ্যে ২৭৬ জন (বা ৫৭.২ শতাংশ) প্রধানমন্ত্রীকে পরপর দুই মেয়াদের বেশি না রাখার সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন। এর মধ্যে ১২৮ জন (২৮.৬ শতাংশ) প্রস্তাবের সাথে একমত এবং সমসংখ্যক ১২৮ জন (২৮.৬ শতাংশ) দৃঢ়ভাবে একমত পোষণ করেছেন। অন্যদিকে, ১৯২ জন (বা ৪২.৯ শতাংশ) এই বিষয়ে নিরপেক্ষ বা অনিশ্চিত অবস্থান প্রকাশ করেছেন। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জরিপে অংশ নেওয়া একজন ভোটারও এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বা দ্বিমত পোষণ করেননি। যাঁরা নিরপেক্ষ ছিলেন তাঁরা মূলত এই ধরনের নিয়ম বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিকগুলো বিবেচনা করছেন। তবে সরাসরি কোনো বিরোধিতা না থাকা প্রমাণ করে যে, নির্বাহী ক্ষমতার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা দরকার এই বিষয়ে জনগণের মনে একটি শক্তিশালী সামাজিক সম্মতি গড়ে উঠেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৪৪৮ জন মানুষের সামাজিক ও জনসংখ্যাগত পরিচয় ছিল যথেষ্ট বৈচিত্র্যময়। পুরুষ ছিলেন ১৮২ জন (৪০.৬ শতাংশ) এবং নারী ২৬৬ জন (৫৯.৪ শতাংশ)। পেশার ক্ষেত্রে ১৫৯ জন উদ্যোক্তা (৩৫.৫ শতাংশ), ১৫২ জন শিক্ষার্থী (৩৩.৯ শতাংশ), ৭৬ জন ব্যবসায়ী (১৭.০ শতাংশ) এবং ৬১ জন বেসরকারি চাকরিজীবী (১৩.৬ শতাংশ)। শিক্ষার বিচারে ১০৩ জন স্নাতকোত্তর (২২.৯ শতাংশ), ১৩৩ জন স্নাতক বা অনার্স (২৯.৭ শতাংশ), ৮৪ জন ডিগ্রি/বিএ পাস (১৮.৮ শতাংশ), ৭২ জন এইচএসসি (১৬.১ শতাংশ) এবং ৫৬ জন এসএসসি পাস (১২.৫ শতাংশ)। আর্থিক দিক থেকে ১৩৫ জন নিম্ন-মধ্যবিত্ত (৩০.১ শতাংশ), ১৯২ জন মধ্যবিত্ত (৪২.৯ শতাংশ) এবং ১২১ জন উচ্চ-মধ্যবিত্ত (২৭.০ শতাংশ) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
মানুষের এই বৈচিত্র্যময় পরিচয়গুলো (যেমন বয়স, শিক্ষা, আয়, পেশা ইত্যাদি) প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা নির্ধারণ সমর্থনের ক্ষেত্রে কী ভূমিকা রাখছে, তা জানতে ‘রিগ্রেশন বিশ্লেষণ’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। সহজ কথায়, এই হিসাবটির কাজ হলো মানুষের জীবনের কোন বিষয়টি তাঁর এই মতামতের পেছনে আসল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে তা খুঁজে বের করা।
গাণিতিক ফলাফলে দেখা যায়, মডেলটির আর-স্কয়ার (R²) মান পাওয়া গেছে .০৯৮ (এবং সামঞ্জস্যকৃত মান .০৮৪, যার প্রমিত ভুল .৭৯৮২১)। এর অর্থ হলো, মানুষের পেশা, লিঙ্গ, বয়স, আয়, শিক্ষা, ধর্ম এবং সামাজিক অবস্থানের মতো সবকটি উপাদান একত্রে মিলে এই প্রস্তাব সমর্থনের কারণগুলোর প্রায় ১০ শতাংশ (৯.৮ শতাংশ) ব্যাখ্যা করতে পারে। বাকি অংশটি নির্ভর করে মানুষের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও পারিপার্শ্বিক ভাবনার ওপর।
একই সাথে হিসাবটির নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা করতে ‘অ্যানোভা’ (ANOVA) পরীক্ষা চালানো হয়। সেখানে দেখা যায়, ৭টি স্বাধীনতার মাত্রায় (df) মূল হিসাবের যোগফল ছিল ৩০.৫১৩ (গড় মান ৪.৩৫৯) এবং ৪৪০টি স্বাধীনতার মাত্রায় অবশিষ্ট ভুলের মান ছিল ২৮০.৩৪৪ (গড় মান .৬৩৭), যেখানে সর্বমোট মান দাঁড়ায় ৩১০.৮৫৭। এই সার্বিক মডেলে এফ-মান (F-value) পাওয়া গেছে ৬.৮৪২, যার তাৎপর্যপূর্ণ সূচক বা পি-মান (p-value) হলো .০০০ (p < .০০১)। অর্থাৎ পুরো হিসাবটি বৈজ্ঞানিক বিচারে অত্যন্ত নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, যখন সবকটি সামাজিক উপাদানের প্রভাব একসাথে রেখে আলাদা করে পরখ করা হয়, তখন দেখা যায় শিক্ষা, আয়, পেশা বা লিঙ্গের প্রভাব বাদ দিলেও কেবল মানুষের বয়স বিষয়টিই মেয়াদের সীমাবদ্ধতা পাওয়ার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে। পরিসংখ্যানে বয়সের ইতিবাচক মান বা বিটা মান পাওয়া গেছে .১৫৯, যেখানে টি-মান t = ৩.০৭৭ এবং পি-মান (p) = .০০২। প্রামাণিক ভাষায় বললে পি-মান (p) = .০০২ নির্দেশ করে যে বিষয়টি কাকতালীয় নয় ভোটারের বয়স যত বেশি, প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ রাখার দাবির প্রতি তাঁর সমর্থন তত বেশি জোরালো ও সুদৃঢ়।
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই সামাজিক ফলাফলের গুরুত্ব অনেক। বয়স্ক ও অভিজ্ঞ নাগরিকরা যাঁরা বিগত কয়েক দশকে দেশের একের পর এক গণতান্ত্রিক সংকট, ক্ষমতার অপব্যবহার, নির্বাচনী ব্যবস্থার ধস এবং একনায়কতন্ত্রের চরম রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁরা ক্ষমতার একক কেন্দ্রীভবনের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি সচেতন। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা অনুধাবন করেছেন যে, ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অনেক বড়, আর সেই প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে হলে শাসনপ্রধানের ক্ষমতার ওপর সাংবিধানিক আইনি লাগাম দেওয়া জরুরি।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই মেয়াদে নির্দিষ্ট করার এই ভাবনা কেবল বাংলাদেশের ভেতরের কথা নয় বরং এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি উন্নত গণতান্ত্রিক চর্চা। বিশ্বের সফল গণতন্ত্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে প্রধান নির্বাহী পদে নির্দিষ্ট মেয়াদের নিয়ম রাখা অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানের ২২তম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ দুই মেয়াদে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সে ২০০৮ সালে সংবিধান সংস্কার করে একই নিয়ম করা হয়। ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও পূর্ব ইউরোপের বহু দেশে দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতন্ত্র ঠেকানোর লক্ষ্যে সর্বোচ্চ পদের মেয়াদ নির্দিষ্ট করার বিধান রাখা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের মতো সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় সরাসরি মেয়াদের সীমাবদ্ধতা না থাকলেও সেখানে দলের ভেতরে নিয়মিত নির্বাচন ও সংসদে সহজে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন করার চর্চা রয়েছে। ফলে কোনো অজনপ্রিয় নেতা বেশিদিন টিকে থাকতে পারেন না। কিন্তু বাংলাদেশের মতো বাস্তবতায়, যেখানে অনুচ্ছেদ ৭০-এর কারণে সংসদে দলীয় প্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলার পথ অবরুদ্ধ এবং রাজনৈতিক দলের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা সীমিত, সেখানে সংবিধানে স্পষ্ট মেয়াদের সীমা বেঁধে দেওয়াই ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার একমাত্র কার্যকর সমাধান।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ পরপর দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করা হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু ইতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসবে। প্রথমত, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে পুরো প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার যে প্রবণতা, তা দুর্বল হয়ে পড়বে। কোনো প্রধানমন্ত্রী নিজেকে চিরস্থায়ী ভেবে সিদ্ধান্ত নেবেন না। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে স্বাভাবিক নিয়মেই নতুন নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে এবং এক ব্যক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমবে। তৃতীয়ত, সরকারি কর্মকর্তারা জানবেন যে নির্দিষ্ট সময় পরপর রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে, ফলে তারা ব্যক্তির বদলে রাষ্ট্রের সংবিধান ও নিয়মের প্রতি অনুগত থেকে দায়িত্ব পালন করবেন। চতুর্থত, মসৃণ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ তৈরি হলে দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পাবে।
একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে সংবিধানে ক্ষমতার সুস্থ ভারসাম্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফায় প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের চাওয়ারই প্রতিফলন। গবেষণার উপাত্ত ও বৈজ্ঞানিক তথ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দেশের অধিকাংশ সচেতন মানুষ এই সংস্কারের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে সুসংহত করতে হলে সব রাজনৈতিক দলকে জনগণের এই অভিপ্রায়কে মেনে নিয়ে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এর চূড়ান্ত রূপ দিতে হবে।
মাহাদী-উল-মোর্শেদ
গবেষক ও নীতি বিশ্লেষক
