সংসদে দাঁড়িয়ে যাদের বলেছিলেন ইতর প্রাণী, রাজপথে তারাই জাতীয় বীর!

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

সংসদে দাঁড়িয়ে যাদের বলেছিলেন ইতর প্রাণী, রাজপথে তারাই জাতীয় বীর!

রাজনীতিতে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু যখন নৈতিকতার চাদরে মুড়িয়ে দ্বিমুখী চর্চা করা হয়, তখন তা শুধু হাস্যকরই নয়, সমাজের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সিফাত আব্দুল্লাহ নামের এক তরুণের চরম অশালীন ভিডিও এবং তা নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের দ্বিমুখী অবস্থান বাংলাদেশের রাজনীতির এক অদ্ভুত স্ববিরোধিতাকে নগ্নভাবে সামনে এনেছে।

ঘটনার সূত্রপাত একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ তোলার আড়ালে সিফাত নামের ওই তরুণ ফেসবুকে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে উদ্দেশ্য করে এমন সব কুরুচিপূর্ণ এবং অকথ্য ভাষা ব্যবহার করেছে, যা কোনো সুস্থ সমাজের ভাষা হতে পারে না। স্বাভাবিকভাবেই সাইবার আইনে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এই চরম অশালীনতাকে পুঁজি করে মাঠে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী। তাদের আমির শফিকুর রহমান জনসভায় দাঁড়িয়ে রীতিমতো হুমকি দিয়ে সিফাতের দ্রুত মুক্তি দাবি করেছেন। শুধু তাই নয়, অকথ্য গালিগালাজ করা এই তরুণকে তিনি নূর হোসেন এবং ডা. মিলনের মতো ঐতিহাসিক শহীদদের সাথে তুলনা করার ধৃষ্টতাও দেখিয়েছেন! ড্যামেজ কন্ট্রোলের জন্য অবশ্য খুব সন্তর্পণে তিনি একটি বাক্য যুক্ত করেছেন “সিফাতের মুখের ভাষা আমরা সমর্থন করি না।”

অথচ একটু পেছনে ফেরা যাক। এই একই ডা. শফিকুর রহমান যখন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তার কণ্ঠে ছিল ভিন্ন সুর, ভিন্ন নৈতিকতা। তৎকালীন সরকার প্রধানের পরিবারকে জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হওয়া মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তিনি রীতিমতো ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। সংসদে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি সেদিন বলেছিলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিবারকে জড়িয়ে যারা অশ্লীল আচরণ করেছে, উনি এখনো বিচার চান নাই, আমি তার পক্ষে তাদের বিচার চাই। ওনার মেয়ে… আল্লাহ তায়ালা আমাকেও দুইটা মেয়ে সন্তান দান করেছেন, আমার মেয়ে। ওনার মেয়ের অসম্মান মানে আমার মেয়ের অসম্মান… মানে আমাদের মেয়ের অসম্মান।”

শুধু তাই নয়, যারা এই ধরনের অশালীন আচরণ করে, তাদেরকে তিনি আখ্যায়িত করেছিলেন “ইতর প্রাণী” হিসেবে। তিনি হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, “এই ইতর প্রাণীগুলা কারা? তাদেরকে নির্মোহভাবে খুঁজে বের করা হোক।”

তাহলে আজ জাতির মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, শালীনতা ও নৈতিকতার সংজ্ঞা কি রাজনৈতিক স্বার্থভেদে বদলে যায়? সংসদে দাঁড়িয়ে যিনি অন্যের পরিবারের সম্মান নিয়ে এতটা সংবেদনশীল, যিনি অশালীনতার বিরুদ্ধে হুংকার দিয়ে গালিগালাজকারীদের ‘ইতর প্রাণী’ বলেন, তিনিই আজ রাজপথে নেমে সেই একই অশালীন আচরণের পক্ষে সাফাই গাইছেন কীভাবে? নিজের রাজনৈতিক ফায়দা লোটার সুযোগ এলে তখন আর গালিগালাজকারীর বিচার চাইতে ইচ্ছে করে না, তখন চরম অসভ্য ভাষায় ‘জারজ’ বা ‘বেজন্মা’ বলা তরুণকে নূর হোসেন বানানোর এক নির্লজ্জ নাটক মঞ্চস্থ হয়।

মুখে শালীনতার বুলি আর ভেতরে চূড়ান্ত উগ্রতাকে প্রশ্রয় দেওয়া এটাই কি তবে তাদের রাজনীতির আসল রূপ?
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আরও একটি ভয়াবহ সত্য উন্মোচিত হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সুকৌশলে দেশের অল্পবয়সী ও নিরীহ যুবকদের মগজধোলাই করছে। অনলাইনে মিথ্যা তথ্য, বানোয়াট ফটোকার্ড এবং গুজব ছড়িয়ে তরুণদের মনে তীব্র বিদ্বেষ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সামান্য কিছু সুযোগ-সুবিধা বা সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে পড়ে এই তরুণরা হয়ে উঠছে এক একটি সাইবার ট্রল। তারা নারীদের হেনস্তা করছে, ভিন্নমতাবলম্বীদের মা-বাপ তুলে গালিগালাজ করছে। আর রাজনৈতিক নির্দেশদাতারা নিরাপদ দূরত্বে থেকে এই উগ্রতাকে ব্যবহার করছে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে। যখন আইনি জটিলতায় পড়ে তরুণদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তখন নেতারা তাদের ‘হিরো’ বানিয়ে নিজেদের রাজনীতি গরম করছেন। “ভাষা সমর্থন করি না” বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করলেও, মূলত নোংরা ভাষায় আক্রমণকারীকে মাথায় তুলে তারা তাদের কর্মীদের একটি স্পষ্ট মেসেজ দিচ্ছেন: “তোমরা মা-বোন তুলে গালিগালাজ চালিয়ে যাও, আমরা তোমাদের পাশে আছি।”

আগামী সংসদ অধিবেশনে কোনো বিবেকবান সংসদ সদস্যের উচিত হবে একটি চমৎকার উদ্যোগ নেওয়া। ফ্লোর নিয়ে পুরো সংসদের সামনে জামায়াত আমিরের সেই পুরোনো ‘ইতর প্রাণী’ খোঁজার আবেগঘন ভিডিওটি বাজিয়ে শোনানো। এরপর সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জানতে চাওয়া “মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা, আপনার সেই ‘ইতর প্রাণী’রা কি তবে এখন আপনারই দলের সম্পদ ও জাতীয় বীর হয়ে গেছে? সংসদে দাঁড়িয়ে আপনি যে বিচার চেয়েছিলেন, রাজপথে নেমে সেই একই অপরাধীদের হিরো বানানোর এই জাদুকরী ভেলকিবাজি আপনি কোথায় শিখলেন?” জাতির সামনে এই স্ববিরোধিতার জবাব তাকে দিতেই হবে।

শেখ রিফাদ মাহমুদ
কলামিস্ট

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন