বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের ভাবনা: মনের যত্ন হোক প্রতিদিনের অভ্যাস

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৭ এএম

আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি যখন ফিরে আসে, তখন আমরা অনেকেই একটু নড়েচড়ে বসি, মনের স্বাস্থ্য নিয়ে দু-চারটে কথা বলি কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতামূলক পোস্ট দিই। কিন্তু দিবসটি পার হলেই কি আমাদের মনের খবর রাখার সেই তাগিদ বজায় থাকে? বাস্তবতা হলো, শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে আমরা যতটা তৎপর, মানসিক ভালো থাকা নিয়ে আমরা এখনো ততটাই উদাসীন। অথচ একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য শরীরের মতো মনের যত্ন নেওয়াটাও সমান জরুরি। বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে, বৈশ্বিক রোগব্যাধির একটি বড় অংশের জন্য এখন এই মানসিক সংকটকেই দায়ী করা হচ্ছে (GBD 2019 Mental Disorders Collaborators, 2022)।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন এবং প্রতি দশজন শিশু-কিশোরের মধ্যে একজন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। অথচ যাদের চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদের ৯০ শতাংশের বেশি কোনো সেবা পান না। সংখ্যাটা শুনলে মনে হয় অনেক দূরের কোনো কথা। কিন্তু একটু ভেবে দেখলে, আমাদের আশপাশের দশজন মানুষের মধ্যেই একজন হয়তো ভেতরে ভেতরে ভীষণ কষ্টে আছেন, অথচ আমরা জানিই না। কারণ তিনি বলতে পারেন না। বললে সমাজ তাকে কী ভাববে, সেই ভয়টা তাকে চুপ করে রাখে।

আমাদের সমাজে এখনো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এক ধরনের সামাজিক কুসংস্কার বা ‘ট্যাবু’ কাজ করে। কেউ যদি বলেন তার শারীরিক কোনো অসুস্থতা হয়েছে, আমরা তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিই। কিন্তু কেউ যখন বলেন তিনি তীব্র বিষণ্নতায় ভুগছেন, একা বোধ করছেন বা কোনো কারণ ছাড়াই তার ভেতরে এক তীব্র মানসিক অস্থিরতা কাজ করছে, তবে সেটাকে ‘বিলাসিতা’ বা ‘মনের ভুল’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সূত্র অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য কেবল কোনো রোগের অনুপস্থিতি নয়; বরং এটি হলো আবেগীয় সুস্থতা, জীবনের চাপ সামলানোর ক্ষমতা এবং ফলপ্রসূ সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার সক্ষমতা (American Psychological Association, 2026)। একে অবহেলা করলে এটি গভীর বিষণ্নতা ও উদ্বেগে রূপ নিতে পারে।

বর্তমান আধুনিক জীবনযাত্রার দ্রুতগতি, তীব্র প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তির অতি-ব্যবহার আমাদের মানসিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কৃত্রিম দুনিয়া আমাদের প্রতিনিয়ত অন্যের জীবনের সাথে নিজের জীবনের তুলনা করতে বাধ্য করছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই অতিরিক্ত ব্যবহার ও স্ক্রিন টাইম মানুষের মধ্যে তীব্র হতাশা, কম আত্মমর্যাদাবোধ এবং বিষণ্নতার লক্ষণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে (The Lancet Psychiatry, 2022)। এই ‘ভার্চুয়াল পারফেকশন’ বা নিখুঁত জীবনের মোড়ক আমাদের ভেতরে এক ধরনের অপ্রাপ্তি এবং একাকীত্ব তৈরি করছে।

মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার অর্থ এই নয় যে জীবনে কখনো দুঃখ বা কষ্ট আসবে না। এর আসল অর্থ হলো, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার সক্ষমতা বা রেজিলিয়েন্স অর্জন করা। আর এই সক্ষমতা এক দিনে তৈরি হয় না, এর জন্য প্রয়োজন প্রতিদিনের জীবনে ছোট ছোট কিছু ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তোলা।

প্রথমত, আমাদের শরীর ও মনের পারস্পরিক সংযোগকে গুরুতে দিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে ঘুমের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ভালো ঘুম মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে জরুরি। অনেকেই ভাবি, রাত জাগা মানে বেশি কাজ করা। অথচ উল্টো, রাত জাগলে পরদিন কাজে মনোযোগ থাকে না, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত গবেষণা বলছে, অনিদ্রা বা ঘুমের ব্যাঘাত দূর করতে পারলে তা মানুষের বিষণ্নতা, তীব্র দুশ্চিন্তা এবং মানসিক অস্থিরতা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনে (The Lancet Psychiatry, 2017)। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত ভালো ঘুম এবং কিছু সময় শারীরিক পরিশ্রম বা হাঁটার অভ্যাস মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোন কমাতে সাহায্য করে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল দুনিয়া থেকে মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া বা ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ করা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত ব্যবধানে ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে থাকলে তা মানুষের মনোযোগ ও মানসিক শান্তি বৃদ্ধি করে। দিনে অন্তত কিছু সময় ফোনটা দূরে রাখুন। পরিবারের সঙ্গে কথা বলুন, বই পড়ুন, বাইরে হাঁটুন। দেখবেন, মন হালকা লাগছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগাযোগ। মানুষ সামাজিক জীব, তাই একা একা সব চাপ সামলানোর চেষ্টা না করে পরিবার, বন্ধু বা বিশ্বস্ত মানুষের সাথে মনের অনুভূতিগুলো ভাগ করে নেওয়া উচিত। গবেষণা বলে, সামাজিক ও পারস্পরিক সহযোগিতা মানুষের মানসিক চাপ দ্রুত প্রশমিত করে (American Psychological Association, 2026)।
পাশাপাশি, নিজের প্রতি সদয় হওয়া জরুরি। আমরা অন্যের ভুল সহজে ক্ষমা করি, কিন্তু নিজের ছোট ভুলটা অনেক দিন মনে রাখি। নিজের সামর্থ্যকে যথেষ্ট ভাবা, সেই সাথে জীবনের ছোট ছোট প্রাপ্তিগুলোর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার অভ্যাস আমাদের মনের ভেতরের নেতিবাচকতা দূর করতে সাহায্য করে।

এবারের মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হওয়া উচিত, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে লুকোচুরি বন্ধ করা। নিজের মন খারাপ বা মানসিক অস্থিরতাকে যেমন স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে হবে, তেমনি চারপাশের মানুষের মনের অবস্থা বোঝার জন্য সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। যদি অবসাদ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা অনিদ্রার মতো সমস্যাগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তবে কোনো সংকোচ না করে পেশাদার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের শরণাপন্ন হতে হবে। অনেকেই মনে করেন মানসিক স্বাস্থ্য সেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তবে আশার কথা হলো দেশের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোতে নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও কাউন্সেলিং সেবা পাওয়া যায়। চিকিৎসকের কাছে যাওয়া কোনো দুর্বলতা নয়, বরং নিজের প্রতি দায়িত্বশীলতার পরিচয়। তাই আসুন, মনের যত্নকে কেবল একটি দিবসের ফ্রেমে বন্দি না রেখে একে আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করি।

জান্নাতুন নূর হায়দার চৌধুরী
মাস্টার্স শিক্ষার্থী, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এবং ট্রেইনি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, মানসিক রোগ বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন