বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর সামরিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা কিংবা রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সময়কাল দেখলেই হয় না। তিনি কীভাবে রাজনীতি ও রাষ্ট্রকে দেখতেন, বাংলাদেশকে কোথায় নিতে চেয়েছিলেন-সেটা বুঝতে হলে তাঁর নিজের লেখা ‘আমার রাজনীতির রূপরেখা’ বইটি পড়া জরুরি।
১৯৩৬ সালে বগুড়ার বাগবাড়ি গ্রামে জন্ম নেওয়া জিয়াউর রহমান ১৯৫৩ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৫৫ সালের সেপ্টেম্বরে কমিশন লাভ করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে ফার্স্ট ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে লাহোরের খেমকারণ সেক্টরে যুদ্ধ করেন। এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের ‘হিলাল-ই-জুরাত’ খেতাব অর্জন করেন। এটি পাকিস্তানের জীবিতদের মধ্যে সর্বোচ্চ সামরিক পদক।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি জয়দেবপুরে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯৭০ সালে দায়িত্ব নেন চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের। আর ১৯৭১ সালে এসে সেই সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতাই তাঁকে নিয়ে যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে।
২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম সংলগ্ন সেক্টরে নেতৃত্ব এবং যুদ্ধের সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ‘বীরউত্তম’ খেতাব—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনের এই অধ্যায়টি পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে ১৯৭৫ সালের আগস্টে তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান হন। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
এই জায়গা থেকেই ‘আমার রাজনীতির রূপরেখা’ বইটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে জিয়াউর রহমান তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা, আদর্শ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তুলে ধরেছেন। বইটি তাঁর নিজের লেখা এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দেওয়া বক্তৃতার সংকলন।
বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি হলো বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। জিয়াউর রহমান মনে করতেন, সংকীর্ণ বিভাজন ও ভেদাভেদ ভুলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় তাই জাতীয় ঐক্য, আত্মনির্ভরতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরেকটি বিষয় ইনক্লসিভ গণতন্ত্রের উৎপাদন্মুখী রাজনীতি। তিনি রাজনীতিকে শুধু বক্তৃতা, দলাদলি কিংবা ক্ষমতার হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। কৃষি, শিল্প ও অর্থনীতির উন্নয়নকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার কথা বলেছেন। একইসঙ্গে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন এবং অর্থনৈতিকভাবে দেশকে স্বনির্ভর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের স্বনির্ভরতার বিষয়টি তাঁর চিন্তায় গুরুত্ব পেয়েছে।
এই রাজনৈতিক চিন্তার ধারাবাহিকতায় তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। তাঁর লক্ষ্য ছিল জাতীয় রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চেতনা জাগানো, রাজনীতিকে গণমুখী করা এবং অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে দেশকে এগিয়ে নেওয়া। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠা এবং সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে জনগণের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
‘আমার রাজনীতির রূপরেখা খুব বড় কোনো বই নয়, কিন্তু এর ভেতরের বিষয়গুলো বেশ বড়। বইটি পড়লে জিয়াউর রহমানকে শুধু একজন সেনা কর্মকর্তা বা রাষ্ট্রপতি হিসেবে নয়, বরং একজন রাজনৈতিক চিন্তক হিসেবেও দেখার সুযোগ তৈরি হয়।
আমার কাছে বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এখানে অন্য কারও চোখ দিয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে দেখার চেষ্টা নেই; বরং তাঁর নিজের লেখা ও বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাকে বোঝার সুযোগ আছে। বাংলাদেশের রাজনীতি, জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তা এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠার আদর্শিক ভিত্তি বুঝতে তাই বইটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি পাঠ।
মোঃ রাকিবুল ইসলাম
শিক্ষার্থী,ডুয়েট
