আজ ১ লা সেপ্টেম্বর ২০২৬-ডুয়েটের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। ২৩ বছর আগে, ২০০৩ সালের এই দিনে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, গাজীপুর ল , ২০০৩-এর মাধ্যমে বিআইটি ঢাকা নতুন পরিচয়ে যাত্রা শুরু করে। আইনটির অধীনে প্রতিষ্ঠানটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি স্বায়ত্তশাসিত সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের ঢাকা ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, গাজীপুর,ডুয়েট।২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর সেই যাত্রার ২৩ বছর পূর্ণ হলো। তবে ডুয়েটের গল্প শুরু ২০০৩ সালে নয়। এর শুরু আরও আগে-১৯৮০ সালে ঢাকার তেজগাঁওয়ে। আর আজ যে ‘ডুয়েট’ নামটি একটি স্বতন্ত্র পরিচয়, সেই নামটিও শুরু থেকেই নির্ধারিত ছিল না। এর পেছনে রয়েছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, ঐক্য, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠানের পরিচয় রক্ষার দৃঢ়তা।১৯৮০ সালে ঢাকার তেজগাঁওয়ে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে ‘কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং, ঢাকা’ নামে ডুয়েটের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার সময় এখানে সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল-এই তিনটি বিষয়ে স্নাতক প্রকৌশল শিক্ষা চালু ছিল।১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ করা হয় এবং এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালে তেজগাঁওয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাস থেকে প্রতিষ্ঠানটি গাজীপুর শহরের কেন্দ্রস্থলে বর্তমান স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়।এরপর আসে ১৯৮৬ সালের অধ্যায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। তখন এর নাম হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ঢাকা (বিআইটি ঢাকা)। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদানের সুযোগ পায়।সময় গড়ানোর সঙ্গে গড়ে ওঠে একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, মেডিকেল সেন্টার, ছাত্রকল্যাণ কেন্দ্র ও অডিটোরিয়ামসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি আসে ২০০৩ সালে-আর তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি আন্দোলন।
ডুয়েট নামকরণের পেছনে ছিল যে আন্দোলন
১৯৮৬ সালে দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ বা বিআইটি করা হলে নামকরণের ক্ষেত্রে জেলার পরিবর্তে বিভাগের নাম যুক্ত করার রীতি অনুসরণ করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় রাজশাহী, খুলনা ও চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম হয় বিআইটি রাজশাহী, বিআইটি খুলনা ও বিআইটি চট্টগ্রাম। একই কাঠামোগত যুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটি গাজীপুর জেলায় অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এর নাম রাখা হয় বিআইটি ঢাকা।এরও আগে প্রতিষ্ঠানটির পরিচয় ছিল ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে। ফলে ‘ঢাকা’ নামটি হঠাৎ করে যুক্ত হওয়া কোনো নাম ছিল না; বরং প্রতিষ্ঠানের পূর্ববর্তী পরিচয় থেকে শুরু করে বিআইটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ দীর্ঘ সময় ধরেই এই নামটি প্রতিষ্ঠানটির পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।২০০৩ সালে বিআইটিগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হলে রাজশাহী, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিআইটি তাদের প্রতিষ্ঠিত বিভাগীয় পরিচয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন নামে আত্মপ্রকাশের পথে এগোয়। কিন্তু বিআইটি ঢাকার ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিকতা অনুসরণ না করে গাজীপুর প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামের প্রস্তাব আসে।এই প্রস্তাবই বিআইটি ঢাকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। তাঁদের প্রশ্ন ছিল একই কাঠামো ও একই নীতিতে প্রতিষ্ঠিত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম যদি তাদের পূর্বপরিচয় ও বিভাগীয় নামের ধারাবাহিকতায় রাখা হয়, তাহলে বিআইটি ঢাকার ক্ষেত্রেই কেন সেই ধারাবাহিকতা ভাঙা হবে?শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল স্পষ্ট-প্রতিষ্ঠানটির নাম হতে হবে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁদের কাছে ‘ঢাকা’ শুধু একটি ভৌগোলিক নাম ছিল না; এটি ছিল প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও দীর্ঘদিনের পরিচয়ের অংশ। আর তাই কেবল প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে গাজীপুরে অবস্থিত এই যুক্তিতে নাম পরিবর্তনকে তাঁরা মেনে নিতে পারেননি।নামকরণের দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন দ্রুত বড় আকার ধারণ করে। তবে আন্দোলনের বিশেষত্ব ছিল এর অহিংস, সুশৃঙ্খল ও সৃজনশীল পদ্ধতি।শিক্ষার্থীরা আন্দোলনকে একটি সংগঠিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসেন। ‘ডুয়েট, গাজীপুর বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর ব্যানারে দল-মতনির্বিশেষে শিক্ষার্থীরা একত্রিত হন। তৎকালীন ছাত্রদলের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরাও এই দাবিতে একই প্ল্যাটফর্মে অবস্থান নেন।আন্দোলনের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল একাধিক স্কোয়াড। ছিল মৃত্যুঞ্জয়ী কমান্ড, ছাত্রী ব্রিগেড, সাংস্কৃতিক স্কোয়াড, কূটনৈতিক স্কোয়াড ও তথ্য সেল।শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পত্রিকা, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে গিয়ে ডুয়েট নামের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করেন। প্রধানমন্ত্রী বরাবর ব্যক্তিগত চিঠিও পাঠানো হয়। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক চিঠি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমা পড়ত।আন্দোলন শুধু মিছিল, স্লোগান কিংবা চিঠির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ক্যাম্পাসে চালু করা হয় ‘ডুয়েট বেতার কেন্দ্র’। সেখানে বিভিন্ন সময়ে গান, কবিতা, নাটক, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন পাঠ এবং আন্দোলনসংক্রান্ত নানা অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো।শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ ব্যানার তৈরি করেন। দেয়ালে ডুয়েটের পক্ষে লেখেন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দেন।শুধু স্লোগান বা মিছিলের মধ্যেই আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিও পালন করেন। কয়েক শ শিক্ষার্থী রক্তদান করেন। অর্থাৎ দাবি আদায়ের আন্দোলন হলেও সেটিকে ধ্বংসাত্মক কোনো পথে না নিয়ে সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন শিক্ষার্থীরা।আন্দোলনে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। শিক্ষকেরাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিছিল ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। ফলে এটি কেবল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন না থেকে ধীরে ধীরে পুরো প্রতিষ্ঠানের মানুষের আন্দোলনে পরিণত হয়।এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে শিক্ষার্থীদের ঐক্য। ভিন্ন রাজনৈতিক মত ও সংগঠনের শিক্ষার্থীরা একটি নির্দিষ্ট দাবিকে সামনে রেখে একসঙ্গে কাজ করেছিলেন।একটি যৌক্তিক ও অভিন্ন দাবির ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিভাজন ভুলে সম্মিলিতভাবে কাজ করা সম্ভব তৎকালীন আন্দোলনের এই অভিজ্ঞতা আজকের শিক্ষার্থীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।শেষ পর্যন্ত সেই আন্দোলনের দাবি বাস্তবায়িত হয়। বিআইটি ঢাকা রূপান্তরিত হয় ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-ডুয়েটে।ফলে আজকের ডুয়েটের পরিচয়ের সঙ্গে সেই নামকরণ আন্দোলনের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।বর্তমানে ডুয়েটের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এই ইতিহাসের গুরুত্ব এখানেই-আজ আমরা যে ‘ডুয়েট’ নামটি গর্বের সঙ্গে বহন করি, সেটি শুরু থেকেই নির্ধারিত ছিল না। এই নামের পেছনে ছিল একদল শিক্ষার্থীর দীর্ঘ আন্দোলন, ঐক্য, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠানের পরিচয় রক্ষার দৃঢ়তা।
চার দশকের পথচলায় বিস্তৃত একাডেমিক পরিসর
আজ ডুয়েট প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের প্রকৌশল শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।বর্তমানে ডুয়েটে চারটি অনুষদের অধীনে ১৪টি বিভাগ, তিনটি ইনস্টিটিউট ও একটি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রকৌশল, স্থাপত্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক বিভিন্ন ডিগ্রি প্রদান করা হয়। পাশাপাশি মৌলিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়েও স্নাতকোত্তর শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে।প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এখানে ভর্তি করা হয়। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ও ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার প্রোগ্রামে ৭৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার বিষয়টিও ডুয়েটের প্রতি শিক্ষার্থীদের চাহিদার প্রতিফলন।একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি, গবেষণা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫টির বেশি ক্লাব ও কমিউনিটি সক্রিয় রয়েছে।গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে ডুয়েটে ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি (OBE)অনুসরণ করা হচ্ছে। একাডেমিক কার্যক্রমের মানোন্নয়ন ও বিভিন্ন স্বীকৃতি অর্জনের ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ সেল কাজ করছে।দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ডুয়েটের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রয়েছে। শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণায়ও গুরুত্ব দিয়ে আসছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালে নিয়মিত গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে।২০২০ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে ক্যাম্পাসব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম, প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইলসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সুবিধা চালু করা হয়েছে।
ডুয়েটের অর্জন শুধু ডুয়েটের নয় বরং সারাদেশের
চার দশকের বেশি সময়ের পথচলায় ডুয়েট দেশের প্রকৌশল শিক্ষাঙ্গনে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে।ডুয়েট থেকে প্রকৌশল শিক্ষা শেষ করে হাজারো গ্র্যাজুয়েট দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অনেকেই টেসলা, অ্যামাজন ও মেটার মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। কেউ কেউ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন।গ্র্যাজুয়েশন শেষে উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই ডুয়েট গ্র্যাজুয়েটরা। তাঁদের উদ্যোগের মাধ্যমে দেশে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থান।ফলে ডুয়েটের অর্জন শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নয়; এটি দেশের প্রযুক্তি, শিল্প ও অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অবদান।গাজীপুরে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু নিজের শিক্ষার্থীদের নিয়েই কাজ করছে না। গাজীপুরকে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শহরে উন্নীত করার বিভিন্ন বিষয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে অবদান রাখছেন। দেশের শিল্প ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ডুয়েটের অবদানও ক্রমাগত বাড়ছে।কিন্তু এই সম্ভাবনার বিপরীতে রয়েছে একটি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।
২৫ একরের ক্যাম্পাসে কতটা সম্ভব?
ডুয়েটের বড় সংকটগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত জমির অভাব। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কার্যক্রম মাত্র প্রায় ২৫একর জমির মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় এই জায়গা অত্যন্ত সীমিত।ফলে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি থাকলেও অনেক প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।ডুয়েট ক্যাম্পাসে এখনও নেই পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, পুকুর, মুক্তমঞ্চ, বিনোদন পার্ক ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠনের জন্য পর্যাপ্ত অফিস কক্ষ।নেই টিএসসি বা ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।পর্যাপ্ত গবেষণাগার ও গবেষণা সুবিধার সংকটও রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের পরিসরও অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
জমির স্বল্পতার বিষয়টি শুধু বর্তমান অবকাঠামোর সংকট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের প্রশ্নও। নতুন বিভাগ চালু করা, গবেষণার পরিধি বাড়ানো কিংবা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন অবকাঠামো নির্মাণ-সবই ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে
আবাসন সংকটের অবসান কি এবার সম্ভব?
সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি ছিল আবাসন ব্যবস্থা। গত কিছুদিন আগেও ডুয়েটের সব শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন নিশ্চিত করা ছিল অনেকটা দূরের বাস্তবতা। শিক্ষার্থীর সংখ্যা তিন হাজারের কম হলেও বর্তমানে ছাত্রদের জন্য ছয়টি এবং ছাত্রীদের জন্য একটি আবাসিক হল রয়েছে। একটি আবাসিক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সব শিক্ষার্থীর আবাসন নিশ্চিত না হওয়া দীর্ঘদিনের সমস্যা ছিল।তবে নতুন হল নির্মাণের পর হয়তো সেই সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। কিন্তু এই সম্ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু বেদনাদায়ক বিদায়ও। নতুন অবকাঠামোর জায়গা করে দিতে ভেঙে ফেলতে হয়েছে অ্যালামনাইদের স্মৃতিবিজড়িত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হল, এফ আর খান হল এবং খুদরত-ই-খুদা হল। অর্থাৎ আবাসন সংকট কাটানোর পথে ডুয়েটকে একই সঙ্গে হারাতে হয়েছে তার ইতিহাস ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কিছু স্থাপনা।শুধু আবাসিক হল নয়, সামনে ভেঙে ফেলতে হবে সেই ভবনটিও, যে ভবনটি ২০১৮ সাল পর্যন্ত ডুয়েটকে একমাত্র ভবনের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত করে রেখেছিল। ফলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মধ্য দিয়ে যখন ডুয়েটের আবাসন সংকট সমাধানের পথ তৈরি হচ্ছে, তখনই প্রশ্ন উঠছে-এই অগ্রগতির বিনিময়ে ডুয়েটের পুরোনো স্মৃতি ও ঐতিহ্যের কতটা হারিয়ে যাচ্ছে?
দ্বিতীয় ক্যাম্পাস, কিন্তু মৌলিক সুবিধা কতটা?
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক নানা সংকট।দ্বিতীয় ক্যাম্পাস থেকে মূল ক্যাম্পাসে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত পরিবহন সুবিধা নেই। দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে এখনও মসজিদ, লিফট ও ক্যান্টিনের মতো মৌলিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবও শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি ভোগান্তি তৈরি করছে।একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম যখন একাধিক ক্যাম্পাসে বিস্তৃত হচ্ছে, তখন দুই ক্যাম্পাসের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় মৌলিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।দ্বিতীয় ক্যাম্পাস তাই শুধু নতুন ভবন বা নতুন জমির বিষয় নয়; এর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন একাডেমিক জীবন, যাতায়াত এবং মৌলিক সুবিধার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
হাজারো গ্র্যাজুয়েট কিন্তু নেই, নিজস্ব অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন
ডুয়েটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘাটতি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের অনুপস্থিতি।হাজারো সফল গ্র্যাজুয়েট দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকলেও তাঁদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার সুযোগ এখনও তৈরি হয়নি।অথচ একটি শক্তিশালী অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক গবেষণা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার সহায়তা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হলে ডুয়েটের ভবিষ্যৎ পথচলা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
২৩ বছর পূর্তিতে প্রশ্নটা তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে?
২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর ডুয়েট একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। আজ ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর সেই যাত্রার ২৩ বছর।এই ২৩ বছরে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে। ডুয়েটের গ্র্যাজুয়েটরা দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং উদ্যোক্তা জগতে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন।কিন্তু একই সময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জমি, গবেষণাগার, আবাসন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবকাঠামো, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের মৌলিক সুবিধা এবং শক্তিশালী অ্যালামনাই নেটওয়ার্কের মতো বিষয়গুলো এখনও প্রশ্ন হয়ে আছে।
তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে-যে বিশ্ববিদ্যালয় দেশের জন্য এত দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি করছে, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে অবদান রাখছে এবং দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক অবকাঠামোগত সংকট আর কতদিন থাকবে?ডুয়েটের শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের জমি ও অবকাঠামোগত সংকটের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পর্যাপ্ত জমি, আধুনিক গবেষণা সুবিধা, সবার জন্য আবাসন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থা এবং একটি শক্তিশালী অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে।আজ যে ‘ডুয়েট’ নামটি গর্বের সঙ্গে বহন করা হয়, তার পেছনে একসময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিল। সেই আন্দোলন দেখিয়েছিল, একটি যৌক্তিক দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হলে পরিবর্তন সম্ভব।যে প্রতিষ্ঠানটি দেশের জন্য অকাতরে দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি করে যাচ্ছে, তারও প্রাপ্য সুযোগ ও পরিসর নিশ্চিত হবে-২৩ বছর পূর্তিতে এটাই ডুয়েট শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা।
মোঃ রাকিবুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, ডুয়েট
