বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একদিকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নতুন নতুন কৌশলগত জোট সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এখন আর শুধু দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় নতুন অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করছে।
এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতার মধ্যেই সামনে এসেছে মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট। ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তিটির মূল লক্ষ্য পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা। চুক্তিতে একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সম্মিলিত নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখার নীতি রয়েছে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশও এই উদ্যোগের বিষয়ে ইতিবাচক আগ্রহ প্রকাশ করেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, বাংলাদেশ মক্কা ডিফেন্স প্যাক্টে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের নেতৃত্ব, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মক্কা প্যাক্টে যোগ দেয়নি। ফলে সামনে যে আলোচনা, সেটি হলো বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগ কতটা লাভজনক, কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে এটি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে একটি নীতিই সামনে রাখতে হবে- সবার আগে বাংলাদেশ।
“সবার আগে বাংলাদেশ”- এটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হতে পারে। বাংলাদেশ কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়। বাংলাদেশ কোনো শক্তির অনুসারীও নয়। বাংলাদেশের উচিত বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র ও শক্তির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং নিজের স্বার্থ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অংশ নেওয়া।
কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রথম প্রশ্ন হতে হবে এতে বাংলাদেশের কী লাভ? বাংলাদেশের নিরাপত্তা কি বাড়বে? অর্থনীতি কি শক্তিশালী হবে? বিনিয়োগ বাড়বে কি? জ্বালানি নিরাপত্তা কি নিশ্চিত হবে?
বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ কি সুরক্ষিত হবে? প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কি বাড়বে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ কি তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অবস্থান। এটাই Bangladesh First।
বাংলাদেশের জন্য মক্কা প্যাক্টকে শুধু একটি সামরিক চুক্তি হিসেবে দেখলে এর পূর্ণাঙ্গ গুরুত্ব বোঝা যাবে না। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একই সঙ্গে জ্বালানি, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব রয়েছে।
অন্যদিকে তুরস্ক বর্তমানে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, ড্রোন, সামরিক শিল্প ও প্রতিরক্ষা উৎপাদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করেছে। পাকিস্তানের রয়েছে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা ও নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব।
এই তিনটি দেশের সমন্বয়ে তৈরি নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তৈরি হলে তা ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ মক্কা প্যাক্ট বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে Defence diplomacy এবং Bconomic diplomacy-এর সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দেশটি একই সঙ্গে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে সক্ষম। ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। চীন বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। ইউরোপ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। আর সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স ও জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে Multi-alignment diplomacy। অর্থাৎ সবার সঙ্গে সম্পর্ক, কিন্তু কারও ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নয়। মক্কা প্যাক্টে সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা সেই কৌশলের একটি অংশ হতে পারে। তবে বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে, কোনো নতুন জোট যেন পুরোনো কোনো অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ না হয়। বাংলাদেশের কূটনীতি হতে হবে Balanced but assertive ভারসাম্যপূর্ণ, কিন্তু আত্মমর্যাদাশীল।
মক্কা প্যাক্টের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য পাকিস্তান। ফলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হবে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক। ১৯৭১ সালের ইতিহাস বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই ইতিহাসের প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান কখনো দুর্বল হওয়া উচিত নয়। কিন্তু একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভবিষ্যৎ জাতীয় স্বার্থও বিবেচনা করতে হয়।
বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো নতুন কৌশলগত সহযোগিতায় যায়, তার অর্থ অতীতকে অস্বীকার করা নয়। বরং এর অর্থ হতে পারে ইতিহাসের জায়গায় ইতিহাস, আর ভবিষ্যতের জায়গায় জাতীয় স্বার্থ। বাংলাদেশের উচিত হবে না অতীত ভুলে যাওয়া; আবার অতীতের কারণে ভবিষ্যতের সব কূটনৈতিক সম্ভাবনাও বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য মক্কা প্যাক্টে যোগদান ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা হতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও এই সম্ভাব্য প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। তাই বাংলাদেশের কোনো নতুন কৌশলগত সিদ্ধান্ত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অযথা সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়।
কিন্তু এর অর্থ এটিও নয় যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অন্য কোনো দেশের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে। বাংলাদেশকে ভারতকে বোঝাতে হবে মক্কা প্যাক্টে সম্ভাব্য অংশগ্রহণ ভারতের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অবস্থান নয়; এটি বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের অংশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গেও বাস্তববাদী ও স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। এখানেই প্রয়োজন পরিণত কূটনীতি।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক সমীকরণ শুধু ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর একটি। তাই মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যাতে বাংলাদেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এখানে আবারও ফিরে আসে একই নীতি সবার আগে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক করবে, কিন্তু ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে নয়। বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক করবে, কিন্তু চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি করে নয়। বাংলাদেশ তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঝুঁকিতে ফেলে নয়। এটাই হবে বাস্তববাদী কূটনীতি। যেখানে ফেরত আসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির একটি মূল দর্শন ও বিখ্যাত উক্তি- “আমরা সবার সাথে বন্ধুত্ব চাই, কারো সাথে বৈরিতা নয়”
মক্কা প্যাক্ট বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কূটনীতির জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প, পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এই তিনটি দেশের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, ড্রোন, সাইবার নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারত্বের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এখানে আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। একটি প্রতিরক্ষা জোটে যোগদানের অর্থ ভবিষ্যতের কোনো সংঘাতে সদস্যদের পারস্পরিক দায়বদ্ধতা তৈরি হতে পারে। ফলে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে এমন কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়, যার সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি জাতীয় স্বার্থ নেই।
বাংলাদেশের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকা এবং একটি সামরিক জোটে অংশগ্রহণ দুটিকে একই বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। সুতরাং বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন হবে- আমরা কি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারব, কিন্তু নিজেদের অপ্রয়োজনীয় সংঘাতের মধ্যে না জড়িয়ে?
মক্কা প্যাক্ট নিয়ে বাংলাদেশের আলোচনায় একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত- Economic diplomacy। যদি বাংলাদেশ নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, শ্রমবাজার ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে এই উদ্যোগের বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বাড়বে।
সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণ, বাংলাদেশি শ্রমিকদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তুরস্কের সঙ্গে প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতা বাড়ানো এসব হতে পারে বাংলাদেশের বাস্তব অর্জনের ক্ষেত্র। অর্থাৎ বাংলাদেশের কূটনীতি শুধু security diplomacy নয়; সেটিকে হতে হবে- Security + Economy + Development.
তবে বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশ যোগ দিলে বিভিন্ন রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ থেকে বিষয়টি মূল্যায়ন করবে। ভারত যেমন বিষয়টিকে নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখবে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইরান ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিও নিজেদের হিসাব করবে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ওপর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ঠিক তখনই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে জাতীয় ঐক্যের। দেশের রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে। সরকারের সমালোচনা থাকবে। বিরোধী মত থাকবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এগুলো স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দল-মত নির্বিশেষে একটি মৌলিক ঐক্য প্রয়োজন। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বিভক্ত রাষ্ট্র সহজে চাপের মুখে পড়ে। আর একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য মক্কা প্যাক্ট নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা। এই উদ্যোগ সফলভাবে পরিচালিত হলে এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। কিন্তু এজন্য সরকারকে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত- জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। দ্বিতীয়ত- সব বড় শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক। তৃতীয়ত- জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত আলোচনা ও ঐকমত্য।
সরকারের উচিত বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, সামরিক বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক অংশীজনদের মতামত নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল তৈরি করা। কারণ এটি শুধু একটি সরকারের সিদ্ধান্ত নয়; এর প্রভাব বাংলাদেশের পরবর্তী বহু বছরের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভুল হবে মক্কা প্যাক্টকে কেবল একটি ‘ইসলামিক ব্লক’ হিসেবে দেখা। আবার এটিকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে জোট হিসেবেও দেখা ঠিক হবে না। বাংলাদেশের উচিত হবে এর মধ্যে নিজের কৌশলগত সুযোগ খুঁজে নেওয়া। বাংলাদেশের কূটনীতি এমন হতে পারে বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে। অংশীদারত্ব সবার সঙ্গে। সহযোগিতা সবার সঙ্গে। কিন্তু সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের স্বার্থে। এটাই হলো Bangladesh First।
বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে এসেছে, যেখানে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৌশলগত অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ যদি মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সম্পর্ক বাড়াতে পারে, তাহলে তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর-কষাকষির ক্ষমতা আরও বাড়বে। মক্কা প্যাক্ট সেই বৃহত্তর কৌশলের একটি সম্ভাব্য অংশ হতে পারে। কিন্তু শর্ত একটাই বাংলাদেশ যেন অন্যের কৌশলের অংশ না হয়ে নিজের কৌশল তৈরি করে।
মক্কা প্যাক্ট বাংলাদেশের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। একই সঙ্গে এটি একটি কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষাও। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারে, নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব তৈরি করতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়াতে পারে।
আবার ভুলভাবে পরিচালিত হলে এটি বিদ্যমান কূটনৈতিক ভারসাম্যকে জটিল করে তুলতেও পারে। তাই সিদ্ধান্ত হতে হবে আবেগ দিয়ে নয়- রাষ্ট্রীয় স্বার্থের কঠোর হিসাবের ভিত্তিতে। বাংলাদেশ কোনো দেশের শত্রু হতে চায় না। বাংলাদেশ কোনো শক্তির অধীনও হতে চায় না। বাংলাদেশ চায় নিজের স্বার্থে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে। আর সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে সবার আগে বাংলাদেশ।
দল-মত যার যার থাকতে পারে। রাজনৈতিক আদর্শ যার যার হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের প্রশ্নে আমাদের অবস্থান হতে হবে এক। কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার ভূগোল নয়, শুধু তার অর্থনীতি নয়, শুধু তার সামরিক সক্ষমতাও নয়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণ। যদি সেই জনগণ জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে কোনো কূটনৈতিক চাপই বাংলাদেশকে তার নিজের স্বার্থ থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ তাই শুধু একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রশ্ন নয়।
এটি বাংলাদেশের সামনে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন তুলে ধরেছে আমরা কি অন্যের কৌশলের অংশ হব, নাকি নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে নিজেদের কৌশল তৈরি করব? নতুন বাংলাদেশের উত্তর হওয়া উচিত স্পষ্ট বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, সহযোগিতা সবার সঙ্গে কিন্তু সবার আগে বাংলাদেশ।
ডাঃ এ, কে, এম আহসান হাবীব নাফি
চিকিৎসক ও রাজনৈতিক কর্মী
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, কমনওয়েলথ স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন
