শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেখানে শেষ করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি সেখান থেকেই এগিয়ে নিতে পারবেন?

সামিউর রহমান
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে বহুমুখী কূটনীতির ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি সেই জায়গা থেকেই বাংলাদেশকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারবেন? বিষয়টি কেবল পিতা-পুত্রের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, কূটনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণের বিষয়টি।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। কোনো একটি দেশ বা শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে মুসলিম বিশ্ব, চীন, পশ্চিমা বিশ্ব এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে সৌদি আরব ও আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, OIC-তে সক্রিয় ভূমিকা এবং ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল উল্লেখযোগ্য। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান Al-Quds Committee-এর কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৮১ সালে এর একটি বৈঠকে অংশ নেন। তবে ইতিহাসের একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালেই OIC-এর সদস্য হয়েছিল। ফলে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে OIC-এর সদস্য করেছিলেন এমন দাবি ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। তাঁর সময়ে বরং বিদ্যমান সদস্যপদকে কাজে লাগিয়ে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরও সক্রিয় ও কৌশলগত পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কূটনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অর্থনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, রেমিট্যান্স এবং উন্নয়ন সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসরকে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্বের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়।

অর্থাৎ তাঁর পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলাদেশের জন্য যত বেশি সম্ভব আন্তর্জাতিক দরজা খোলা রাখা। চার দশকের বেশি সময় পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে সেই দর্শনকে নতুন বাস্তবতায় প্রয়োগ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়ায়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিমের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাক্ষাৎ করেন।

এই সফরের তাৎপর্য শুধু বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ASEAN-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার আগ্রহও এই সফরে গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ ASEAN-এর Sectoral Dialogue Partner হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং মালয়েশিয়া এ উদ্যোগের প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা। কারণ ASEAN শুধু একটি আঞ্চলিক সংগঠন নয়; এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল বাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ASEAN-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর হলে ভবিষ্যতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শ্রমবাজার এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যেও নতুন একটি কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান সম্প্রতি মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। বাংলাদেশকে এতে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ওই চুক্তিতে যোগ দেয়নি। এখানেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে তৈরি হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা এক বিষয়; আর একটি প্রতিরক্ষা কাঠামোর অংশ হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির দেশের জন্য এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক ও জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় রাখতে হবে।

তাহলে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক ধারার মিল কোথায়? মিলটি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসরকে বিস্তৃত করার চিন্তায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর সময়ে মুসলিম বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেছিলেন। একই সঙ্গে চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে সেই বহুমুখী সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। একদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্ভাব্য নিরাপত্তা সহযোগিতা; অন্যদিকে মালয়েশিয়া ও ASEAN-এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সম্পর্ক। এর পাশাপাশি ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।

এটাই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত বহুমুখী কূটনীতির পরীক্ষা। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য শুধু অতীতের নীতি অনুসরণ করাই যথেষ্ট হবে না। তাঁকে সেই নীতিকে বর্তমান সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে হবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে OIC, মধ্যপ্রাচ্য, চীন, পশ্চিমা বিশ্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার নতুন সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আজকের পৃথিবীতে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ASEAN, Indo-Pacific, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো।

তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে কাজটি যেমন বড়, তেমনি চ্যালেঞ্জও কঠিন। তাঁকে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যে বাংলাদেশ সৌদি আরবের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে পারে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে পারে, তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে পারে, ASEAN-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে পারে এবং একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে।

কোনো একটি বলয়ের অংশ হয়ে যাওয়া নয়, বরং সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া এটাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে সময়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিসর বড় করার চেষ্টা করেছিলেন, আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে সেই পরিসর আরও বড় করার সুযোগ রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো তিনি কি সেই সুযোগকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগাতে পারবেন? যদি পারেন, তাহলে সেটি শুধু পিতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করা হবে না; বরং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বহুমুখী কূটনৈতিক দর্শনকে নতুন সময়ের বাস্তবতায় আরও এগিয়ে নেওয়ার একটি নতুন অধ্যায় হতে পারে। কারণ একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু তার সামরিক সক্ষমতা, অর্থনীতি বা জনসংখ্যায় নয়। প্রকৃত শক্তি হলো বিশ্বের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখেও নিজের জাতীয় স্বার্থে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।

শেষ পর্যন্ত এই কূটনীতির সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিস্তৃতি বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মর্যাদা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নতিতে বাস্তব ফল বয়ে আনবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেখানে শেষ করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি সেখান থেকেই বাংলাদেশকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে পারেন তাহলেই সেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তরাধিকার সত্যিকার অর্থে দেশের অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত হবে।

লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট
সামিউর রহমান

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর