সংসদের প্রতিটি মিনিটের মূল্য: তথ্যের রাজনীতি বনাম আবেগের রাজনীতি
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ শুধু আইন প্রণয়নের স্থান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এখানে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করবেন, মন্ত্রীরা তার উত্তর দেবেন, আইন নিয়ে বিতর্ক হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো জনসমক্ষে পর্যালোচিত হবে এটাই সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
তাই সংসদের সময়ের মূল্য শুধু ঘড়ির কাঁটায় মাপা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনগণের অর্থ, প্রত্যাশা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের একটি পুরোনো বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় সংসদের কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতি মিনিটে গড়ে প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার টাকা ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গিয়েছিল। সেই হিসাবে সংসদের সময় নষ্ট হওয়ার অর্থ শুধু রাজনৈতিক সুযোগ নষ্ট হওয়া নয়; এর সঙ্গে জনগণের অর্থেরও একটি আর্থিক মূল্য জড়িত।
এই বাস্তবতায় সাম্প্রতিক সংসদীয় বিতর্কটি তাই শুধু একজন মন্ত্রী ও একজন বিরোধীদলীয় নেতার বাকবিতণ্ডা হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা ধরা পড়বে না।
সংসদে প্রশ্নের সঙ্গে তথ্যও থাকা দরকার
২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে উত্তেজনা তৈরি হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের একটি অংশকে বিরোধী দল আপত্তিকর হিসেবে দেখেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে, তিনি সংসদে উত্থাপিত কিছু প্রশ্নকে ‘শাহবাগ স্কয়ার’ ও ‘পল্টনের বক্তৃতা’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এর প্রতিবাদ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
এখানে ভাষা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ অবশ্যই আছে। সংসদে একজন মন্ত্রীর কাছ থেকে যেমন তথ্যনির্ভর উত্তর প্রত্যাশিত, তেমনি তাঁর ভাষাতেও সংসদীয় শালীনতা থাকা উচিত।
তবে এর পাশাপাশি আরেকটি মৌলিক প্রশ্নও রয়েছে সংসদে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করার সময় প্রশ্নটি কতটা সুনির্দিষ্ট এবং তথ্যনির্ভর?
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ এটি একটি রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে। কিন্তু সংসদীয় প্রশ্নকে আরও কার্যকর করতে হলে বলা প্রয়োজন কোথায় অপরাধ হয়েছে, কখন হয়েছে, কতটি মামলা হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, তদন্তের অবস্থা কী এবং সরকারের কোন পদক্ষেপকে অপর্যাপ্ত মনে করা হচ্ছে।
এ ধরনের প্রশ্নের সামনে সরকারও সহজে সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে পাশ কাটাতে পারে না।
অর্থাৎ একজন বিরোধী সংসদ সদস্যের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হওয়া উচিত তথ্য।
ব্যক্তিগত বাকযুদ্ধ নয়, তথ্য দিয়ে সরকারকে চ্যালেঞ্জ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ডা. শফিকুর রহমান প্রশ্ন করেন, ‘উনি নিজেকে কী মনে করেন?’ এবং বলেন, শিক্ষকতা করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে পারেন; তারা তাঁর ছাত্র হতে সংসদে আসেননি।
এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে তীব্র। কিন্তু এখানেই একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আসে সরকারকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে চ্যালেঞ্জ করার পদ্ধতি কোনটি?
ব্যক্তিগত বাক্যবিনিময়, উত্তপ্ত বক্তব্য এবং প্রতিবাদ অবশ্যই রাজনৈতিক কর্মকৌশলের অংশ হতে পারে। কিন্তু একজন বিরোধী নেতা যদি কোনো মন্ত্রীর সামনে সরকারি নথি, পরিসংখ্যান, মামলা ও মাঠপর্যায়ের নির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরেন, তাহলে সেই বক্তব্যের রাজনৈতিক ও সংসদীয় শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়।
আবেগ মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে, কিন্তু তথ্য সরকারকে জবাব দিতে বাধ্য করতে পারে।
এটাই হওয়া উচিত শক্তিশালী বিরোধী রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি।
ওয়াকআউটের প্রশ্নটি আরও জটিল
তবে সাম্প্রতিক ওয়াকআউটকে শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ হিসেবে দেখা সঠিক হবে না। সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরোধী দলের ওয়াকআউটের সঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং অন্যান্য সংস্কার-সংক্রান্ত বিল সংসদে উত্থাপনের প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের আপত্তি যুক্ত ছিল। বিরোধীদলীয় নেতা পূর্ণাঙ্গ সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি তোলেন এবং জুলাই জাতীয় সনদের গণরায়ের প্রসঙ্গও সামনে আনেন।
অতএব ওয়াকআউটকে একমাত্র ‘বাহানা’ বলা যেমন অতিরঞ্জিত হবে, তেমনি এটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি কার্যকর রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে গ্রহণ করাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।
সংসদীয় ওয়াকআউট একটি স্বীকৃত প্রতিবাদী কৌশল। কিন্তু তার কার্যকারিতা নির্ভর করে কী কারণে ওয়াকআউট করা হচ্ছে, তার আগে কী তথ্য তুলে ধরা হয়েছে এবং ওয়াকআউটের পর জনগণের জন্য কী রাজনৈতিক ফলাফল তৈরি হচ্ছে তার ওপর।
রাজনীতিতে ‘ইস্যু’ এবং ‘পারসেপশন’
আধুনিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক narrative বা বয়ান নির্মাণ। কোনো ঘটনা শুধু কী ঘটেছে, তা দিয়েই জনমত তৈরি হয় না; ঘটনাটি কীভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে রাজনৈতিক দলগুলো নানা ধরনের কৌশল ব্যবহার করতে পারে emotional framing, victim narrative, symbolic politics কিংবা issue shifting। একটি বক্তব্যের মূল বিষয় থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে তার আবেগগত দিককে সামনে আনা তার একটি উদাহরণ হতে পারে।
তবে এসব কৌশল কোনো নির্দিষ্ট দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে প্রয়োগ করার আগে দলটির ধারাবাহিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করা জরুরি।
সাম্প্রতিক রাজনীতিতে ‘জুলাই’ শব্দটির ব্যবহারও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। ‘জুলাইয়ের চেতনা’, ‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা’, ‘জুলাইয়ের ভোট’ এসব এখন রাজনৈতিক বয়ানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জামায়াত-শিবির ও এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা ও তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে।
কিন্তু এখানেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থাকা উচিত
জুলাইয়ের নাম উচ্চারণ করলেই কি জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করা যায়?
যদি জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে থাকে জবাবদিহি, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, সুশাসন ও জনগণের অধিকার, তাহলে কোনো দল সেই আদর্শ কতটা ধারণ করছে তা বিচার করতে হবে তাদের বাস্তব কর্মকাণ্ড দিয়ে।
কারণ পারসেপশন এবং পারফরম্যান্স এক বিষয় নয়।
জুলাই কারও একার সম্পত্তি নয়
গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস কোনো একক রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। যারা সেই আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং যারা পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছেন সবাই সেই ইতিহাসের অংশ।
তাই কোনো দল যদি নিজেদের জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় ধারক হিসেবে উপস্থাপন করে, জনগণের স্বাভাবিক প্রশ্ন হওয়া উচিত তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে?
একই প্রশ্ন অবশ্য সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই কোনো দল নিজেকে জনগণের একমাত্র প্রতিনিধি ঘোষণা করলেই জনগণ তা মেনে নেবে না। জনগণ তাদের কর্মকাণ্ড বিচার করবে।
শেষ কথা
আজ বাংলাদেশের সংসদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল সরকার-বিরোধী দলের রাজনৈতিক সংঘাত নয়। বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংসদকে কতটা কার্যকর, তথ্যনির্ভর এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা যায়।
সরকারের দায়িত্ব প্রশ্নের উত্তর তথ্য দিয়ে দেওয়া।
বিরোধী দলের দায়িত্ব প্রশ্ন করা তথ্য দিয়ে।
আর সংসদ সদস্যদের সবার দায়িত্ব জনগণের অর্থে পরিচালিত সংসদের সময়কে রাজনৈতিক নাটকের বদলে রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করা।
কারণ সংসদ কারও ব্যক্তিগত মঞ্চ নয়।
প্রতিটি মিনিট জনগণের।
জুলাইয়ের নাম কে বেশি বলল, সেটি হয়তো সাময়িকভাবে রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত অন্য প্রশ্ন করবে
কে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করল?
কে জনগণের অধিকার রক্ষা করল?
কে কথার সঙ্গে কাজের মিল রাখল?
সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো রাজনৈতিক দল নিজেরা লিখবে না।
উত্তর লিখবে বাংলাদেশের জনগণ।
সামিউর রহমান, লেখক ও একটিভিষ্ট
