আগামী প্রজন্মকে পরিবেশকর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের ভূমিকা ও ট্রি গার্ডিয়ান উদ্যোগ

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৭ পিএম

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের যে বিরূপ প্রভাব আজ দৃশ্যমান, তা থেকে আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশও মুক্ত নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা এবং ঋতুচক্রের পরিবর্তন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রকৃতির প্রতি সুবিচার করার সময় এখনই। এই চরম সংকটকালে একটি সবুজ, বাসযোগ্য ও নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করা আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আগামী প্রজন্মকে কেবল পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত করলেই চলবে না; তাদের পরিবেশবান্ধব, জলবায়ুকর্মী এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আর এই মানুষ গড়ার মহান কাজটি সবচেয়ে নিপুণভাবে করতে পারেন আমাদের শিক্ষকমণ্ডলী। একজন শিক্ষক কেবল বইয়ের জ্ঞান দেন না, তিনি শিক্ষার্থীর মনন, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির স্থপতি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যে যুগান্তকারী ও দূরদর্শী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন, তা বাস্তবায়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হতে পারে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। শিক্ষকরা তাঁদের সৃজনশীলতা, মেধা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারেন। শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালের বাইরের প্রকৃতিও যে একটি বিশাল পাঠশালা, শিক্ষকরাই পারেন সেই উপলব্ধি শিক্ষার্থীদের মাঝে জাগ্রত করতে। পাঠ্যবইয়ের পরিবেশবিদ্যার পাশাপাশি হাতে-কলমে বৃক্ষরোপণ, স্কুল প্রাঙ্গণে বাগান তৈরি এবং প্রকৃতি বিষয়ক নানা গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে তাঁরা শিক্ষার্থীদের মনে পরিবেশ রক্ষার বীজ বপন করতে পারেন।

তবে আমাদের একটি বিষয় গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে শুধু ঘটা করে গাছ লাগালেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একটি চারা গাছকে মাটিতে পুঁতে দেওয়ার পর তার বেঁচে থাকা ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করাটিই সবচেয়ে বেশি জরুরি। ঠিক এখানেই আসে ‘গাছের অভিভাবক’ বা ‘ট্রি গার্ডিয়ান’ ধারণাটির অনবদ্য প্রাসঙ্গিকতা।

একজন শিক্ষার্থীকে যখন শুধু একটি গাছ লাগাতে না বলে ওই গাছটির ‘অভিভাবক’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন মনস্তাত্ত্বিকভাবে ওই গাছের প্রতি তার এক নিবিড় ভালোবাসা ও মমতা তৈরি হয়। অভিভাবকের দায়িত্ব পেয়ে তারা গাছটিকে নিজের সন্তানের মতো বড় করে, নিয়মিত পানি দেয়, আগাছা পরিষ্কার করে এবং রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। নিজের হাতে লাগানো একটি ছোট চারাকে চোখের সামনে একটু একটু করে মহীরুহে পরিণত হতে দেখা, একটা সময় সেই গাছে নতুন পাতা গজানো, ফুল ফুটতে দেখা বা ফল ধরতে দেখা একজন শিক্ষার্থীর জন্য এটি এক রোমাঞ্চকর শিক্ষাসফর। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা শুধু গাছ বড় হতে দেখে না, বরং নিজেরাও ধৈর্য, মমত্ববোধ এবং প্রকৃতির প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার পাঠ গ্রহণ করে। তারা বুঝতে শেখে, একটি গাছের জীবন রক্ষা করা মানে সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর আয়ু বৃদ্ধি করা। দায়িত্ববোধের এই চর্চা তাদের ভবিষ্যতে একজন দায়িত্বশীল, সহমর্মী ও পরিবেশসচেতন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে।

এই জীবনমুখী দর্শনকে ধারণ করেই এ বছর ‘এসআরআই ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ ১০ হাজার গাছের চারা রোপণ ও বিতরণের এক বিশাল কর্মসূচি অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। আমরা প্রথাগত বৃক্ষরোপণের বাইরে গিয়ে ভিন্নধর্মী এক উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা শিক্ষার্থীদের হাতে শুধু চারা তুলে দিইনি, তাদের সেই চারার ‘গাছের অভিভাবক’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব অর্পণ করেছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর গাছের প্রতি শিক্ষার্থীদের আবেগ, দায়বদ্ধতা ও প্রতিশ্রুতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। তারা এই গাছগুলোকে সযত্নে বড় করে তুলবে।

শিক্ষকদের সঠিক দিকনির্দেশনা, অনুপ্রেরণা এবং শিক্ষার্থীদের এই আন্তরিক অভিভাবকত্ব এই দুইয়ের অপূর্ব মেলবন্ধনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা শুধু সংখ্যায় নয়, গুণগত ও দৃশ্যমানভাবেও সফল হবে। গাছের প্রতি এই যত্ন ও ভালোবাসার মাধ্যমেই আমাদের সন্তানেরা আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর, স্বচ্ছ, দূষণমুক্ত এবং সবুজ পরিবেশ উপহার দিতে সক্ষম হবে।

আসুন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ আমরা সবাই মিলে একটি সবুজ বিপ্লবের সূচনা করি। আমাদের শিক্ষার্থীদের হাতে শুধু বই-খাতা নয়, একটি করে সবুজ প্রাণও তুলে দিই এবং তাদের সেই প্রাণের সুযোগ্য অভিভাবক হিসেবে গড়ে তুলি। কারণ, আজকের এই শিশুরাই কালকের বাসযোগ্য সবুজ পৃথিবীর পাহারাদার।

শেখ মোঃ রকিবুল ইসলাম অধ্যক্ষ, বাহাদুরপুর কারিগরি স্কুল এন্ড কলেজ ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক, এসআরআই ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন