শিক্ষার্থীদের নৈতিক অবক্ষয় রোধ ও মূল্যবোধ সৃষ্টিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৮ এএম

বর্তমান সমাজব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি বিষয় আমাদের খুব গভীরভাবে ভাবায়। চারপাশের চোখধাঁধানো প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আর জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্তহীন প্রতিযোগিতায় আমরা কি তবে প্রকৃত মানুষ গড়ার আসল উদ্দেশ্য থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি? পত্রিকার পাতা খুললেই কিশোর অপরাধ, মাদকের থাবা কিংবা ইভটিজিংয়ের মতো খবরগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, শুধু বইয়ের পাতায় আটকে থাকা শিক্ষা আমাদের সন্তানদের সঠিক পথের দিশা দিতে পারছে না। এই ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়ের যুগে শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ তৈরিতে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা তাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল পাঠদান বা সিলেবাস শেষের কোনো যান্ত্রিক কারখানা নয়; এটি শিক্ষার্থীর মনন, দৃষ্টিভঙ্গি এবং চারিত্রিক ভিত গড়ার সবচেয়ে বড় পাঠশালা। একজন শিক্ষার্থী দিনের একটি বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ সময় কাটায় তার শিক্ষক ও সহপাঠীদের সাথে। তাই শিক্ষকের জীবনাচরণ, কথা বলার ধরন এবং নৈতিকতা সরাসরি প্রভাব ফেলে শিক্ষার্থীর কোমল মানসিকতায়। বিভিন্ন আন্তজার্তিক গবেষণায় শিক্ষকের নৈতিকতা এবং শিক্ষার্থীদের নিকট তাঁর গ্রহণযোগ্যতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে একটি শিক্ষার্থীবান্ধব ও ভীতিহীন পরিবেশ তৈরি করেন, তখন শিক্ষার্থীরা শুধু পড়া শেখে না; তারা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখে এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করতে শেখে।

মূল্যবোধ বা নীতি নৈতিকতা কোনো মুখস্থ করার বিষয় নয়, এটি দৈনন্দিন জীবনে চর্চার বিষয়। সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধ এবং দায়িত্ববোধ এসব গুণাবলি শ্রেণিকক্ষের ভেতর থেকেই চর্চা শুরু হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমরা বাহাদুরপুর কারিগরি স্কুল এন্ড কলেজে সবসময় এই বিষয়গুলোর ওপর জোর দিয়ে আসছি। একজন শিক্ষার্থী যখন প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে ক্লাসে উপস্থিত হতে অভ্যস্ত হয়, নিজের চারপাশ পরিষ্কার রাখে এবং অন্যের ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল আচরণ করে, তখন তার মাঝে স্বাভাবিকভাবেই একটি ইতিবাচক মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। ছোটবেলার এই ছোট ছোট শৃঙ্খলাই তাকে ভবিষ্যতের বড় যেকোনো সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিশৃঙ্খলা থেকে দূরে রাখে।

সমাজ সংস্কারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মূল অনুঘটকের কাজ করতে হবে। বাল্যবিবাহ, যৌতুক প্রথা বা মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধিগুলো সমাজকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে এই বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা ও গঠনমূলক আলোচনা হওয়া অত্যন্ত জরুরি, যা শিক্ষকদের সমাজ সংস্কারমূলক অবদানের একটি বড় অংশ। শিক্ষার্থীরা যখন বুঝতে শিখবে এই ব্যাধিগুলো ব্যক্তি ও সমাজের জন্য কতটা ধ্বংসাত্মক, তখন তারা নিজেরাই নিজেদের পরিবার ও সমাজে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। বয়ঃসন্ধিকালের মানসিক পরিবর্তন এবং নারী-পুরুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে নিয়মিত কাউন্সেলিং করা হলে ইভটিজিংয়ের মতো ব্যাধি সমাজ থেকে চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব।

পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি সহশিক্ষা বা কো-কারিকুলার কার্যক্রম শিক্ষার্থীর মানবিক বিকাশে জাদুর মতো কাজ করে। রোভার স্কাউটস, স্বেচ্ছায় রক্তদান বা বৃক্ষরোপণের মতো সেবামূলক কাজগুলোতে যুক্ত থাকলে শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মকেন্দ্রিকতা দূর হয়। তারা সমাজের প্রতি, প্রকৃতির প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতা অনুভব করতে শুরু করে। এই জীবনমুখী দর্শন থেকেই ‘এসআরআই ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে আমরা দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজের সাথে যুক্ত করে আসছি। শিক্ষার্থীদের হাতে চারা তুলে দিয়ে তাদের ‘গাছের অভিভাবক’ বানানোর যে উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি, তার মূল লক্ষ্যই হলো তাদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার জন্ম দেওয়া। যে শিশু বা কিশোর একটি চারাগাছকে পরম মমতায় বড় করতে শেখে, সে কখনো সমাজের অন্য কোনো মানুষের বা রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে পারে না।

ডিজিটাল আসক্তির এই যুগে শিক্ষার্থীরা যখন ভার্চুয়াল জগতেই বেশি সময় কাটাচ্ছে, তখন তাদের বাস্তব জগতের মানবিক অনুভূতিগুলোর সাথে যুক্ত রাখা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শিক্ষকদের হতে হবে তাদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ও পথপ্রদর্শক।

আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে, সর্বোচ্চ জিপিএ পাওয়া একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যদি নীতিহীন বা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তবে তার সেই মেধা দেশ ও দশের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। কিন্তু একজন সাধারণ মানের শিক্ষার্থীও যদি সৎ, নীতিবান এবং মানবিক হয়, তবে সে সমাজের জন্য বড় আশীর্বাদ। তাই নম্বরভিত্তিক প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড় থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের সন্তানদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে উঠুক মানবিকতা, সততা ও মূল্যবোধ চর্চার সবচেয়ে বড় তীর্থস্থান। আজকের এই নীতিবান ও মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষার্থীরাই কালকের সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে।

শেখ মোঃ রকিবুল ইসলাম অধ্যক্ষ, বাহাদুরপুর কারিগরি স্কুল এন্ড কলেজ ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক, এসআরআই ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন