শ্রাবণের বৃষ্টিস্নাত এই জুলাই মাসে প্রকৃতি যখন নতুন প্রাণের স্পন্দনে জেগে ওঠে, তখন স্বভাবতই আমাদের সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা এবং আগামী প্রজন্ম নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি হয়। আমরা প্রায়শই একটি ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে থাকি যে, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো কেবল সিলেবাস শেষ করা এবং পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করা। জিপিএ-৫ পাওয়ার এই অন্তহীন ও যান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় আমরা অনেক সময় ভুলেই যাই যে, শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য হলো একজন শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণ মানুষ ও দায়িত্বশীল সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। আর এই পরিপূর্ণ মানুষ গড়ার ক্ষেত্রে পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ বা সহশিক্ষা কার্যক্রম।
ক্লাসরুমের চার দেয়ালের বাইরেও যে এক বিশাল, বাস্তব এবং জীবনমুখী পাঠশালা রয়েছে, সহশিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের সেই পাঠশালার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। একজন শিক্ষার্থী যখন বইয়ের পাতার বাইরে এসে বাস্তব জগতের বিভিন্ন গঠনমূলক কাজের সাথে যুক্ত হয়, তখন তার মধ্যে এমন কিছু মানবিক ও সামাজিক গুণাবলির বিকাশ ঘটে, যা কোনো বই পড়ে শেখা সম্ভব নয়।
উদাহরণস্বরূপ, বিএনসিসি, রোভার স্কাউটস বা রেড ক্রিসেন্টের মতো সেবামূলক সংগঠনগুলোর কথা বলা যায়। এসব সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকলে একজন শিক্ষার্থীর মাঝে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই শৃঙ্খলাবোধ, সময়ানুবর্তিতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরি হয়। বর্ষার এই সময়টাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বন্যার ঝুঁকিতে থাকে, কিংবা যখন কোনো নদীভাঙন বা বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে, তখন এই স্কাউট বা স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষার্থীরাই সবার আগে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি থেকে শুরু করে শীতার্ত বা বন্যার্ত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ এসব মানবিক উদ্যোগে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে যে গভীর সহমর্মিতা ও পরোপকারী মনোভাব তৈরি হয়, তা তাদের সারাজীবনের জন্য একেকজন মানবিক সুনাগরিকে পরিণত করে।
সহশিক্ষা কার্যক্রমের আরেকটি বড় দিক হলো পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা সৃষ্টি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চরম সংকটকালে পরিবেশ রক্ষায় তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আষাঢ়-শ্রাবণের এই সময়টা বৃক্ষরোপণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। এই বর্ষায় শিক্ষার্থীদের যদি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করা যায়, তবে তা তাদের মানসিক বিকাশে দারুণ প্রভাব ফেলে। নিজের হাতে একটি চারা রোপণ করে তাকে পরম মমতায় বড় করার এই যে এক্সট্রা-কারিকুলার চর্চা, এটি একজন শিক্ষার্থীকে নিঃস্বার্থ হতে শেখায় এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলে।
বর্তমান সমাজের সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হলো কিশোর অপরাধ, মাদকাসক্তি, ইভটিজিং এবং বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধিগুলো। এই ব্যাধিগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখতে সহশিক্ষা কার্যক্রম জাদুর মতো কাজ করে। স্কুল-কলেজে নিয়মিত খেলাধুলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতা, দেয়ালিকা প্রকাশ বা বিজ্ঞান মেলার আয়োজন শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধা বিকাশের পথ সুগম করে। তারা যখন এই ধরনের সৃষ্টিশীল কাজে ব্যস্ত থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মাদকের মতো মরণনেশা বা গ্যাং কালচারের মতো অপরাধমূলক কাজ থেকে দূরে থাকে। শুধু তাই নয়, সামাজিক সচেতনতামূলক বিভিন্ন ক্যাম্পেইন বা ক্লাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যখন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ বা যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শেখে, তখন তারা নিজেরাই সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
বাহাদুরপুর কারিগরি স্কুল এন্ড কলেজে আমরা সবসময় শিক্ষার এই প্রায়োগিক দিকটির ওপর বিশেষ জোর দিয়ে থাকি। শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে আমরা চেষ্টা করি তাদের ভেতরকার সুপ্ত প্রতিভা ও মানবিক গুণাবলিকে জাগিয়ে তুলতে। আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল পাঠদানের জায়গা নয়, এটি একটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণের সবচেয়ে বড় সূতিকাগার।
আজকের এই জুলাইয়ের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আমাদের নতুন করে শপথ নেওয়া প্রয়োজন। নম্বরের পেছনে ছুটে শিক্ষার্থীদের শৈশব-কৈশোরকে যান্ত্রিক না করে দিয়ে, আসুন তাদের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ করে দিই। যে শিক্ষার্থী বিতর্ক করে, মাঠে ঘাম ঝরিয়ে খেলাধুলা করে, মানুষের বিপদে রক্ত দেয় কিংবা পরম মমতায় একটি গাছ বড় করে সে কখনো দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারে না, সে কখনো মানুষের অধিকার হরণ করতে পারে না। আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের শুধু জিপিএ-৫ প্রাপ্ত মেধাবী মুখ নয়, প্রয়োজন সহমর্মী, নীতিবান এবং দায়িত্বশীল সুনাগরিক। আর এই সুনাগরিক গড়ার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ।
শেখ মোঃ রকিবুল ইসলাম
অধ্যক্ষ, বাহাদুরপুর কারিগরি স্কুল এ্যান্ড কলেজ ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক, এসআরআই ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন
