সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন সংসদ সদস্য একসঙ্গে বিদেশ সফরে রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬ জনের সঙ্গে স্ত্রীও আছেন। এছাড়াও দলের আরও কয়েকজন নেতা, পরিবারের সদস্য ও একজন লেখক এই সফরে রয়েছেন। জামায়াতের পক্ষ থেকে ১৭ দিনের এই সফরকে ‘শিক্ষা সফর’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বিদেশে সফরত নেতাদের সঙ্গে আলাপাকালে জানা গেছে, গত ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল, দলের নেতাদের পালামেন্টের অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল। তাই দলের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এমপিদের বিদেশে নেওয়া হয়েছে। ইসলামী চারটি দেশের সংসদব্যবস্থা, নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানার পাশাপাশি অভিজ্ঞতা বিনিময়ই এ সফরের উদ্দেশ্য।
আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এক বা একাধিক প্রতিনিধি দলে ভাগ হয়ে দলের সংসদ সদস্যরা ইউরোপের দেশ সফরে যাবেন বলেও জানান তারা।
জানা গেছে, গত ১৩ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়া দিয়ে তাদের এই সফর শুরু করেছেন। এরপর তারা সিঙ্গাপুর হয়ে বর্তমানে ফিলিপাইনে আছেন। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর সেখান থেকে তারা সৌদি আরবে যাবেন। সেখানে ওমরাহ করার কথা রয়েছে। ওমরাহ পালন শেষে আগামী ৩০ সেপ্টম্বর ও পহেলা অক্টোবর তাদের দেশে ফেরার কথা বলেছেন।
জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সফরকারী দলের ৩৪ জন এমপির মধ্যে ২৫ থেকে ২৬ জন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গেছেন। তাদের সঙ্গে আরও আছেন ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, সাবেক এমপি ও সম্প্রতি জামায়াতে যোগ দেওয়া মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান ও তার স্ত্রী এবং লেখক জিয়াউল হক। দলের তারা জামায়াতের আমিরের অনুমতি নিয়ে এমপিরা বিদেশ সফরে এসেছেন। এ ছাড়া দলের সংসদ সদস্যরা বিদেশ সফরের বিষয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকারকেও অবহিত করেছেন।
সূত্র জানায়, ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর দুই দফায় সফরকারী দলের সদস্যরা মালয়েশিয়ায় পৌঁছান। সেখানে প্রথম তিন দিন অবস্থান করেন তারা। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে যান। সেখান থেকে গত ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার ফিলিপাইনে পৌঁছেছেন। সফর শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাবেন তারা। পথে বাহরাইনে যাত্রাবিরতি রয়েছে।
সূত্র জানায়, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান একাধিক দেশ সফর করতে পারেন। এ ছাড়া দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের ২৬ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র সফরের জন্য অনাপত্তি নিয়েছেন।
মালয়েশিয়া সফরের সময় জামায়াতের এমপিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দেশটির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও রাজনৈতিক দল কেদিলান রাকাইয়াতের আন্তর্জাতিক–বিষয়ক ব্যুরোর প্রধান মাসজলি মালিক।তিনি ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড ইসলামিক স্টাডিজ (আইএআইএস) মালয়েশিয়ার সঙ্গেও যুক্ত।
জামায়াতের সূত্র বলছে, মাসজলি মালিক নিজ উদ্যোগে এমপিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর সিটি সেন্টার, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়াসহ (আইআইইউএম) বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখেছেন দলের সংসদ সদস্যরা।
জামায়াতের একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, সংসদ সদস্যদের অনেকে আগে বহির্বিশ্ব ঘুরে দেখার সুযোগ পাননি। উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বর্তমান পরিস্থিতি, কীভাবে সেসব দেশ উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন— সবমিলিয়ে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি কিংবা নলেজ শেয়ারিংয়ের একটা ট্যুর। এশিয়ার উন্নত দেশগুলোর সংসদ পদ্ধতি কেমন, নেতৃত্ব কীভাবে কাজ করে, রাস্তা-ঘাট কিভাবে উন্নত করছে এই বিষয়গুলো প্র্যাকটিকালি বোঝার জন্যই এই সফর।
সফরকারী দলের সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কালবেলাবেক বলেন, সংসদীয় আচার-আচরণের অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি ইসলামী দেশগুলো কিভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার করছেন তার অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্যই আমাদের এই সফর। মুসলিম দেশগুলো কিভাবে এগোচ্ছে, উন্নতি কি করছে, তারা কিভাবে কাজ করে, শিক্ষাব্যবস্থা কিভাবে চলছে, রাস্তা-ঘাটসহ দেশগুলোর অবকাঠামোগুলো কিভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে- এগুলো সরাসরি দেখার জন্য এসেছি আমরা।
তিনি বলেন, জামায়াতের অনেকেই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন। আবার অনেকেরই দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করাই এই সফরের উদ্দেশ্য। এই সফরকে একধরনের প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচি হিসেবে উল্লেখ করেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রচার ও মিডিয়া সেলের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জামায়াতের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এর আগেও দলের অনেক সদস্য বিদেশে গেছেন। এই সফর তারই ধারাবাহিকতা। তবে এবার বিশেষভাবে এমপিদের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইন: মালয়েশিয়া থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে পৌঁছান জামায়াতের এমপিরা। সেখানে নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি পরিদর্শন করেন তারা। ২০২৫ সালের গ্লোবাল র্যাঙ্কিং অব একাডেমিক সাবজেক্টসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বের সেরা হিসেবে স্থান পেয়েছিল। দলটি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একটি সিম্পোজিয়ামেও অংশ নেয়। সেখানে সিঙ্গাপুরের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর প্রেক্ষাপটসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সিঙ্গাপুর সফর শেষে শনিবার ফিলিপাইনে পৌঁছেন তারা। দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার কথা রয়েছে তাদের। এছাড়া ফিলিপাইনে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছেন।
সফরের থাকা ৩৪ সংসদ সদস্য হলেন ঢাকা-৫ আসনের মোহাম্মদ কামাল হোসেন, ঢাকা-১৪ আসনের মীর আহমদ বিন কাসেম, খুলনা-৬ আসনের মো. আবুল কালাম আজাদ, পিরোজপুর-১ আসনের মাসুদ সাঈদী, শেরপুর-১ আসনের মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, খুলনা-২ আসনের এস কে জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল এবং বাগেরহাট-২ আসনের শেখ মঞ্জুরুল হক রাশেদ, রংপুর-৬ আসনের মো. নুরুল আমীন, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের মো. মাসুদ পারভেজ, নওগাঁ-২ আসনের মো. এনামুল হক, চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের মো. রুহুল আমীন, গাজীপুর-৪ আসনের সালাহউদ্দিন, কুড়িগ্রাম-৪ আসনের মো. মোস্তাফিজুর রহমান, নড়াইল-২ আসনের মো. আতাউর রহমান, ঢাকা-৪ আসনের সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, ময়মনসিংহ-৬ আসনের মো. কামরুল হাসান, নীলফামারী-৪ আসনের আবদুল মুনতাকিম, কুড়িগ্রাম-১ আসনের মো. আনোয়ারুল ইসলাম, গাইবান্ধা-৫ আসনের মো. আবদুল ওয়ারেস, গাইবান্ধা-১ আসনের মো. মাজেদুর রহমান, নীলফামারী-২ আসনের আলফারুক আবদুল লতিফ, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, জয়পুরহাট-১ আসনের মো. ফজলুর রহমান, নীলফামারী-১ আসনের মো. আবদুল সাত্তার, চাপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের মো. মিজানুর রহমান, পাবনা-৩ আসনের মুহাম্মদ আলী আছগার, পাবনা-৪ আসনের মো. আবু তালেব মন্ডল, রংপুর-১ আসনের মো. রায়হান সিরাজী, নীলফামারী-৩ আসনের ওবায়দুল্লাহ সালাফী, নেত্রকোনা-৫ আসনের মাসুম মোস্তফা, মেহেরপুর-১ আসনের মো. তাজউদ্দিন খান, কুষ্টিয়া-৪ আসনের মো. আফজাল হোসেন, গাইবান্ধা-২ আসনের মো. আবদুল করিম এবং যশোর-৫ আসনের গাজী এনামুল হক।
