উচ্চশিক্ষায় নীরব মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ও জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশঃ সামাজিক ক্ষত ও রাষ্ট্রীয় দায়

মাহাদী-উল-মোর্শেদ
প্রকাশ : ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসকে এক নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু স্বৈরাচারের পতন আর পরিবর্তনের এই জোয়ারের আড়ালে আমাদের তরুণ প্রজন্মের মনোজগতে ঘটে গেছে এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়। রাজপথের গুলির শব্দ, সহপাঠীর নিথর দেহ দেখার স্মৃতি আর ট্রমা তরুণদের এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কার ও অর্থনীতি পুনর্গঠন নিয়ে নীতি-নির্ধারকদের টেবিলগুলো যখন সরগরম, তখন ক্যাম্পাসের ছাত্রছাত্রীদের জমতে থাকা এই মানসিক ভাঙন যেন অনেকটাই অলক্ষ্যে থেকে যাচ্ছে। কিন্তু মূল সত্যটা খুব সোজা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একটা প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে কোনো দেশই কোনোদিন টেকসই সংস্কার বা উন্নতি করতে পারে না।

উচ্চশিক্ষার এই ঝকঝকে জীবনের আড়ালে ক্ষতটা কত গভীর, তা গবেষণার উপাত্তেই ধরা পড়ে। ২০২৫ সালে রচিত ‘সেন্টার ফর সাইকোলজিক্যাল হেলথ’-এর গবেষক সাদিয়া শারমিন ও ‘সেন্টার ফর রিসার্চ ইন মাল্টিডিসিপ্লিন – সিআরএম’-এর প্রধান গবেষক মাহাদী-উল-মোর্শেদের যৌথ গবেষণায় এই সত্যটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে দেশের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত এই গবেষণার উপাত্ত অনুযায়ী, প্রায় ৭৭% নারী শিক্ষার্থী (৭৬.৫২%) এবং ৭৩%-এর কাছাকাছি পুরুষ শিক্ষার্থী (৭২. ৯০%) তীব্র মানসিক চাপে দিন কাটাচ্ছেন। পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের (পিটিএসডি) চিত্র আরও সংবেদনশীল; ৫৭.৫% নারী এবং ৪৮.৩১% পুরুষ শিক্ষার্থী গুরুতর পিটিএসডিতে আক্রান্ত। হতাশার দিক থেকে ৩৫.৪% নারী ও ২১.৬১% পুরুষ শিক্ষার্থী তীব্র বিষণ্ণতায় ভুগছেন। তবে উদ্বেগের চিত্রটি সবচেয়ে সংকটজনক ৮৬.৭৩% পুরুষ এবং ৯২.৬৮% নারী শিক্ষার্থী গভীর উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, যার মধ্যে ৭১.১২% নারী ও ৬৬.২৮% পুরুষ শিক্ষার্থীর উদ্বেগ অতিমাত্রায় গুরুতর (শারমিন ও মোর্শেদ, ২০২৫)।
রাজনৈতিক বা সামাজিক এই ট্রমার বাইরেও ক্যাম্পাসের প্রতিদিনের নানা বাস্তব সমস্যা তরুণদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।

২০২৬ সালে মানসিক স্বাস্থ্য ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান “বন্ধু” (BONDHU)-র উদ্যোগে পরিচালিত একটি বিস্তৃত গবেষণায় (Socio-demographic Predictors of Depression among University Students in Bangladesh: Evidence from Regression Modeling) মোর্শেদ, চৌধুরী, ভূঁইয়া, মরিয়ম, রিয়া, রাফি, আরজু, নুবায়রা, আক্তার, মনিরা, নাজ ও মাহমুদ, ২০২৬) শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক ও জীবনযাত্রার আসল ছবিটা সামনে নিয়ে এসেছে। এই গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রায় ৭৪.২% বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী কোনো না কোনো পর্যায়ের বিষণ্ণতায় ভুগছেন। এর মধ্যে ২৫.৮% শিক্ষার্থী ক্যম্পাসে আসার পর জীবনের কোনো না কোনো সময় আত্মহত্যার কথা ভেবেছেন। অথচ ২২.৫% শিক্ষার্থী নিজেরা ভেতরে ভেতরে তীব্রভাবে অনুভব করছেন যে তাঁদের পেশাদার কাউন্সেলিং দরকার, কিন্তু সামাজিক লোকলজ্জা আর ভালো সুযোগের অভাবে তাঁরা সেই সহায়তার মুখ দেখছেন না।

শিক্ষার্থীদের এই মানসিক সংকট শুধু মনের ভেতরেই আটকে নেই, তা শারীরিক জীবনকেও তিলে তিলে শেষ করছে। ক্যাম্পাসে ভালো সিজিপিএ ধরে রাখা আর চাকরির বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার তাড়নায় শিক্ষার্থীরা খাওয়া-ঘুমের মতো মৌলিক চাহিদার কথা ভুলে যাচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে, মোর্শেদ ও অন্যদের (২০২৬) গবেষণার উপাত্ত বলছে, ৫৫.২% শিক্ষার্থী নিয়মিত সকালের নাস্তাই করেন না এবং ২৫% শিক্ষার্থী দিনে তিন বেলা খাওয়ার সুযোগ পান না। এমনকি ৪৩.৮% শিক্ষার্থী শারীরিক সুস্থতার জন্য দৈনিক যেটুকু পানি পান করা দরকার ততটুকুও পান করছেন না।

বাস্তব জীবনের এই মানসিক চাপ ও ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা থেকে একটু আরাম পেতে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকছেন মোবাইলের স্ক্রিনে, যা স্বস্তি দেওয়ার বদলে উল্টো সংকট বাড়িয়ে দিচ্ছে। যেমন গবেষণায় দেখা যায় ৫৪.৫% শিক্ষার্থী দিনে ৫ ঘণ্টারও বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পার করেন। ৮৭.৪% শিক্ষার্থী ঘুম থেকে ওঠার মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে মোবাইল ফোন হাতড়ান, যার মধ্যে ৫৪% চোখ মেললেই স্ক্রিনের নীল আলোতে ডুবে যান। কিন্তু ভার্চুয়াল জগতের এই উপস্থিতি রাতের পর রাত তাঁদের জাগিয়ে রাখছে ফলে ২২.৮% শিক্ষার্থী ভুগছেন তীব্র অনিদ্রায় (মোর্শেদ ও অন্যান্য, ২০২৬)।

একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের যান্ত্রিক পড়াশোনার চাপ কেড়ে নিচ্ছে তরুণদের সৃজনশীলতা। উদাহরণস্বরূপ, মাত্র ২৬.৩% তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পরও তাঁদের প্রিয় শখটা টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন। বাকি ৬৩.৫% শিক্ষার্থী ইচ্ছা থাকলেও সময়ের অভাবে শখের চর্চা করতে পারছেন না এবং ১০.২% শিক্ষার্থীর জীবন থেকে শখ শব্দটাই হাওয়া হয়ে গেছে। নোট আর পরীক্ষার চাপে ২৯.১% শিক্ষার্থী দিনে এক ঘণ্টাও নিজের পছন্দের কোনো বই পড়ার সময় পান না। এর ওপর আছে নিরাপত্তার অভাব ৩৫.১% শিক্ষার্থী নিজ ক্যাম্পাসে নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না।
শারমিন ও মোর্শেদ (২০২৫) এবং মোর্শেদ ও অন্যদের (২০২৬) গবেষণায় পাওয়া এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয় এগুলো আমাদের পুরো শিক্ষা ও সমাজ ব্যবস্থার গলদগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিচ্ছে।

রাজনীতিতে মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্তি ও বাস্তবায়নের তাগিদঃ

এতদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির মূলধারায় মানসিক স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে গিয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নির্বাচনী ইশতেহারে মানসিক স্বাস্থ্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে একটি ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ এবং নীতিগত মোড় তৈরি হয়েছে। দলটির শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নীতিতে প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রের মাধ্যমে মানসিক সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং তরুণদের সাইকো-সোশ্যাল সহায়তার বিষয়টি জায়গা পেয়েছে, যা রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার বিচারে নিঃসন্দেহে একটি বড় পদক্ষেপ।

তবে ইশতেহারে বাক্য যুক্ত হওয়াতেই কাজ শেষ হয়ে যায় না এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো কাগজ-কলমের এই অঙ্গীকারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠপর্যায়ে রূপান্তর করা। সরকার ও নীতি-নির্ধারকদের এখন কিছু সুনির্দিষ্ট জায়গায় কাজ করতে হবেঃ

১. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘মানসিক স্বাস্থ্য সেল’ কার্যকর করাঃ

ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির আলোকে দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন ‘স্টুডেন্ট ওয়েলবিং সেল’ গঠন করে স্থায়ী পেশাদার সাইকোলজিস্ট নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

২. জুলাই ট্রমা নিরাময় ও ফ্রি হেল্পলাইনঃ

আন্দোলন থেকে আসা মানসিক চাপ ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেসে ভোগা শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক সাপোর্ট নেটওয়ার্ক ও ২৪/৭ ফ্রি হেল্পলাইন চালু করা জরুরি।

৩. তৃণমূল পর্যন্ত মানসিক সেবার নেটওয়ার্কঃ

মফস্বল বা দূরদূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীরা যেন ছুটি বা যেকোনো সংকটে নিজ এলাকাতেই প্রাথমিক সাইকো-সোশ্যাল সাপোর্ট পান, সে উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্য কার্ড বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে সার্ভিস নিশ্চিত করা।

৪. ক্যাম্পাসে সুস্থ জীবনধারা ও সৃজনশীল চর্চা ফিরিয়ে আনাঃ

কেবল জিপিএ-কেন্দ্রিক পড়ো-পড়ো মানসিকতা থেকে বেরিয়ে ক্যাম্পাসে খেলাধুলা, বই পড়া ও সংস্কৃতির চর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে। অতীতে শহীদ জিয়াউর রহমান যেভাবে তরুণদের সমাজগঠন ও উৎপাদনে যুক্ত করেছিলেন, ঠিক তেমনি তারেক রহমানের ঘোষিত আধুনিক রাজনীতিতেও তরুণদের স্বাস্থ্যকর জীবনচর্চা নিশ্চিত করতে হবে।

একটি মানসিকভাবে সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী তরুণ সমাজই পারে নতুন বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে মানসিক স্বাস্থ্য স্থান পাওয়া যেমন আশার কথা, ঠিক তেমনি একে দ্রুত বাস্তবায়নে রূপ দেওয়াটাই হবে জুলাই বিপ্লবের রক্ত ও ত্যাগের প্রতি আসল শ্রদ্ধা।

মাহাদী-উল-মোর্শেদ
গবেষক ও পলিসি অ্যানালিস্ট

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন