ছাত্রদল নেতা নূর আলমের আত্মদান ও আগামীর বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি

শেখ রিফাদ মাহমুদ
প্রকাশ : ৪ আগস্ট ২০২২, ১০:১৯ পিএম

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রতিটি বাঁক রক্তে রঞ্জিত। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সবখানেই রাজপথ ভিজেছে এ দেশের তরুণদের রক্তে। ২০২২ সালের ৩১ জুলাই ভোলার রাজপথে যে বর্বরোচিত ও নৃশংস ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল, তার পরিণতিতে ৩ আগস্ট রাজধানীর এক হাসপাতালে জীবনপ্রদীপ নিভে গেল ভোলা জেলা ছাত্রদলের সংগ্রামী সভাপতি নূর আলমের। এর আগে একই ঘটনায় পুলিশের বুলেটে প্রাণ হারিয়েছিলেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আবদুর রহিম।

তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের অভূতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধি এবং অসহনীয় লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে আয়োজিত একটি শান্তিকামী ও গণতান্ত্রিক সমাবেশে যেভাবে স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর অনুগত পুলিশ বাহিনী সরাসরি গুলি চালিয়েছে, তা প্রমাণ করে যে শাসকদল বাকশালীয় কায়দায় দেশ চালাতে গিয়ে সম্পূর্ণ ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী রূপ ধারণ করেছে। নূর আলমের এই আত্মত্যাগ এবং ক্ষরণ হওয়া প্রতি ফোঁটা রক্ত আজ আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার ঐতিহাসিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। পুলিশের গুলিতে একের পর এক প্রাণ ঝরে যাওয়া প্রমাণ করে যে, নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার চেয়ে প্রতিবাদী কণ্ঠ রোধ করাই এখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে বাংলাদেশ আজ এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দাম, বিদ্যুতের নাম করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠন ও পাচার এবং বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে দেশে একতরফাভাবে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পেটের খিদে ও হাহাকার। মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা দুর্নীতির মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী ও তাদের চাটুকার গোষ্ঠী হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে বেগম পাড়া ও পিকে হালাদারদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা আজ দেউলিয়া হওয়ার পথে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে দেখা দিয়েছে তীব্র টান।

একটি গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র হলে এমন সংকটে সরকার জনগণের পাশে দাঁড়াত এবং দুর্নীতির রন্ধ্র বন্ধ করত। কিন্তু চরম জনবিচ্ছিন্ন, ভোটডাকাতির মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে রাখা আওয়ামী লীগ সরকার বেছে নিয়েছে দমনের পথ। জনগণ যখন পেটের তাগিদে, সন্তানকে দুবেলা দুমুঠো অন্ন জোগাতে না পেরে এবং বিদ্যুতের দাবিতে রাজপথে নেমেছে, তখন এই স্বৈরাচারী শাসক তাদের মুখে তুলে দিয়েছে তপ্ত সীসা। ভোলায় ছাত্রদলের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের এই তাণ্ডব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি সুপরিকল্পিত ফ্যাসিবাদী বার্তা ‘প্রতিবাদ করলেই মৃত্যু’।

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভোট ছাড়া ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে পুরোপুরি দলীয়করণের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে চলেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনগণের সেবক না বানিয়ে তাদের বানানো হয়েছে বিরোধী দল দমনের পেটোয়া বাহিনী। গুম, খুন, গায়েবি মামলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ফাঁদে পিষে ফেলা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি কায়েম করে গোটা দেশকে এক বিশাল কারাগারে পরিণত করা হয়েছে।

ইতিহাস সাক্ষী, ভয় দেখিয়ে বা বুলেটের জোরে সাময়িকভাবে রাজপথ ফাঁকা করা গেলেও জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণকে কোনো দিন ঠেকিয়ে রাখা যায় না। আওয়ামী লীগ সরকার আজ এতটাই ভীত ও দেউলিয়া হয়ে পড়েছে যে, বিরোধী দলের সাধারণ প্রতিবাদ সমাবেশ দেখলেও তাদের ক্ষমতার তাসের ঘর কাঁপতে শুরু করে।

ভোলা জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নূর আলম ছিলেন সেই সংগ্রামী চেতনারই এক মূর্ত প্রতীক। তিনি জানতেন, এই স্বৈরাচারী সরকারের আমলে রাজপথে নামার অর্থই হলো জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। তবুও তিনি পিছু হটেননি। জনগণের ভোটাধিকার এবং চাল-ডাল-তেলের দাম কমানোর আন্দোলনে তিনি ভোলার রাজপথে সহযোদ্ধাদের নিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন বুক চিতিয়ে। পুলিশের রক্তচক্ষু ও বুলেটের সামনে তিনি মাথা নত করেননি।

নূর আলমের এই আত্মদান প্রমাণ করে যে, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এখনো এ দেশের কোটি তরুণ ও ছাত্রসমাজের প্রধান আশার আলো। নূর আলম আজ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক অমর প্রতীক। তার আত্মত্যাগ ছাত্রদলের প্রতিটি নেতাকর্মীকে আরও বেশি ইস্পাতকঠিন শপথে বলীয়ান করেছে। যে পতাকাকে নূর আলম রক্ত দিয়ে রঞ্জিত করে গেছেন, সেই পতাকাকে বিজয়ী না করা পর্যন্ত ছাত্রদলের কোনো সৈনিক ঘরে ফিরে যাবে না।

আজ দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক ও সাধারণ পেশাজীবী মানুষ এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। তারা বুঝে গেছে, এই ফ্যাসিবাদী ও বাকশালী সরকারকে ক্ষমতায় রেখে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান রক্ষা করা সম্ভব নয়। একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করাই এখন একমাত্র পথ।

যে পতাকার জন্য, যে গণতন্ত্রের জন্য এবং যে সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য নূর আলম নিজের প্রাণ উৎসর্গ করলেন, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই হবে তার প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা। স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের চেইন ভেঙে বাংলাদেশ আবার মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেবে। ছাত্রদলের হাত ধরে, বিএনপির নেতৃত্বে রাজপথে যে গণজোয়ার শুরু হয়েছে, তা এই ফ্যাসিবাদী শাসনকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবেই। শহীদ নূর আলম অমর হয়ে থাকবেন আমাদের বিপ্লবে, আমাদের স্লোগানে এবং আগামীর মুক্ত ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে।

শেখ রিফাদ মাহমুদ
উপদেষ্টা পর্ষদ সদস্য, গ্লোবাল স্টুডেন্ট ফোরাম

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর