পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট হওয়া উচিত এমন এক পরিসর, যেখানে হাতে-কলমে শিক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী প্রযুক্তিকে বোঝে, দক্ষতা অর্জন করে এবং কর্মজীবনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। এটি এমন কোনো শিক্ষাব্যবস্থা হতে পারে না, যেখানে শিক্ষার মান, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের ঘাটতি একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থায় আজও এমন এক বাস্তবতা বিদ্যমান।
কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। সরকারও কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার হার বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ালেই কারিগরি শিক্ষা শক্তিশালী হয় না। প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার, যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম, পর্যাপ্ত ব্যবহারিক শিক্ষা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ এবং শিক্ষাজীবন শেষে সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ।
বর্তমান বাস্তবতা বরং উল্টো চিত্রই দেখাচ্ছে। দেশের সরকারি ও বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউগুলোতে বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকা পড়ে থাকছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মোট আসন ছিল প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৫০০টি। এর বিপরীতে ভর্তি হয়েছে মাত্র ৬৮ হাজার ৭৮২ জন। অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ আসনই ফাঁকা ছিল।
এটি কেবল শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহের বিষয় নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকেতও বটে। একজন শিক্ষার্থী চার বছর সময় দিয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করার পর যদি কর্মক্ষেত্রে কম বেতন, সীমিত সুযোগ এবং পদোন্নতির অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন, তাহলে মাধ্যমিকের পর সে কেন এই শিক্ষাব্যবস্থা বেছে নেবে এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশে মেধার অভাব নেই। পলিটেকনিকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদেরও স্বপ্ন আছে। তারা প্রকৌশল, শিল্প, উৎপাদন, নির্মাণ, বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রযুক্তি খাতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা শুধু সনদ দেবে না, বাস্তব দক্ষতাও তৈরি করবে।
পলিটেকনিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়ার কথা হাতে-কলমে শিক্ষা। অথচ অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি, গবেষণাগার ও প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই। শিক্ষার্থী যদি আধুনিক যন্ত্র, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, যন্ত্রনির্ভর নকশা, কম্পিউটারভিত্তিক উৎপাদন কিংবা শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত অন্যান্য প্রযুক্তির সঙ্গে যথাযথভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ না পায়, তাহলে কর্মক্ষেত্রে গিয়ে তার কাছ থেকে আধুনিক দক্ষতা আশা করা কতটা বাস্তবসম্মত?
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষক সংকট। কারিগরি শিক্ষায় শুধু শিক্ষক থাকলেই হয় না; প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে হালনাগাদ রাখা শিক্ষক। প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। শিল্পকারখানায় যে প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান যদি তার চেয়ে বহু বছর পিছিয়ে থাকে, তাহলে শিক্ষার্থী ও কর্মবাজারের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে দুর্বল সংযোগ। একজন শিক্ষার্থী কী শিখছে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান আসলে কী ধরনের দক্ষ জনবল চাচ্ছে এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে কারিগরি শিক্ষা তার মূল উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে না। শিক্ষাক্রম তৈরি থেকে শুরু করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং চাকরিতে প্রবেশ প্রতিটি ধাপে শিল্পখাতের সঙ্গে পলিটেকনিকের কার্যকর সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।
কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতাও শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করছে। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে, ডিপ্লোমা সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও তাদের শুরুর বেতন তুলনামূলকভাবে কম। অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেও উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন ব্যক্তির তুলনায় ডিপ্লোমাধারীরা কম বেতন ও সীমিত সুযোগ পান। ফলে একজন শিক্ষার্থীর কাছে প্রশ্ন তৈরি হয় চার বছর ডিপ্লোমা করার পর যদি কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা না পাওয়া যায়, তাহলে এই পথে আসার যৌক্তিকতা কোথায়?
সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ। একজন ডিপ্লোমা শিক্ষার্থী তার শিক্ষাজীবনকে আরও এগিয়ে নিতে চাইলে পথটি সহজ হওয়া উচিত। কিন্তু উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাকে অতিরিক্ত সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয় করে অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করতে হয়। এতে ডিপ্লোমা শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
এখানে একটি মানসিক সমস্যাও রয়েছে। সমাজে এখনো অনেকের ধারণা, কারিগরি শিক্ষা মানে অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদার শিক্ষা। অথচ উন্নত দেশগুলোতে কারিগরি শিক্ষা শিল্পোন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। একজন দক্ষ কারিগরি কর্মী ও প্রযুক্তিবিদ একটি দেশের উৎপাদনব্যবস্থার জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একজন গবেষক বা প্রকৌশলীও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে এই বিষয়টি বোঝার সংস্কৃতি এখনো যথেষ্ট তৈরি হয়নি।
পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ আবার এমন একটি পরিচয়-সংকটের মধ্যেও পড়ে, যেখানে তারা নিজেদের দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন পায় না। অথচ দেশের শিল্প, অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতে দক্ষ ডিপ্লোমাধারী জনবলের প্রয়োজন রয়েছে। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই জনবল তৈরি করার মতো পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি কি না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পলিটেকনিকগুলোর প্রশাসনিক ও একাডেমিক স্বাধীনতার প্রশ্ন। কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজন সাধারণ শিক্ষার তুলনায় ভিন্ন। এখানে দ্রুত শিক্ষাক্রম পরিবর্তন, শিল্পখাতের সঙ্গে সমন্বয়, নতুন প্রযুক্তি সংযোজন এবং দক্ষ শিক্ষক তৈরির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতার কারণে যদি একটি নতুন প্রযুক্তি শিক্ষাক্রমে যুক্ত হতে বছরের পর বছর লেগে যায়, তাহলে শিক্ষার্থী কর্মবাজারে প্রবেশের আগেই প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে পড়বে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, পলিটেকনিক শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরির প্রতিষ্ঠান নয়। এখান থেকেই ভবিষ্যতের দক্ষ জনবল, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ ও শিল্পখাতের প্রয়োজনীয় কর্মী তৈরি হওয়ার কথা। তাই পলিটেকনিকের উন্নয়ন মানে শুধু শিক্ষার্থীর উন্নয়ন নয়; এটি দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন।
করণীয় তাই পরিষ্কার। প্রথমত, প্রতিটি পলিটেকনিকের গবেষণাগার ও কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র আধুনিক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি তাঁদের নিয়মিত শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাধ্যতামূলক শিক্ষানবিশ ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাক্রম নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। পঞ্চমত, ডিপ্লোমাধারীদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ আরও সহজ, স্বচ্ছ ও সম্প্রসারিত করতে হবে। সর্বোপরি, কর্মক্ষেত্রে তাঁদের দায়িত্ব, দক্ষতা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের তরুণেরা শুধু একটি সনদ পাওয়ার জন্য পলিটেকনিকে ভর্তি হয় না। তারা একটি দক্ষ ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে আসে। সেই স্বপ্নকে বাস্তব করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাত-সবার।পলিটেকনিকগুলোকে যদি শুধু আসন পূরণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সংকট থেকেই যাবে। এগুলোকে গড়ে তুলতে হবে দক্ষতা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানের শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে। কারণ যে দেশ শিল্পায়ন করতে চায়, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়তে চায় এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে চায়, তাকে সবার আগে তার কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।
বাংলাদেশের পলিটেকনিকগুলো বিকশিত না হলে শুধু কিছু আসন ফাঁকা থাকবে না-ফাঁকা থেকে যাবে দেশের শিল্প ও অর্থনীতির সম্ভাবনার একটি বড় অংশ।
মোঃ রাকিবুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, ডুয়েট
