রাজনীতির ইতিহাসে কিছু দল থাকে, যাদের শক্তি কেবল ক্ষমতায় থাকার মধ্য দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তাদের প্রকৃত শক্তির পরীক্ষা হয় তখন, যখন তারা ক্ষমতার বাইরে থাকে; যখন তাদের নেতৃত্বকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা হয়, সংগঠনকে দুর্বল করার চেষ্টা হয়, কর্মীদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন ও দমন-পীড়নের অভিযোগ, আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শেষ কথা বলে ফেলে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে তেমনই এক নাম।
৪৮ বছরের পথচলা শেষ করে দলটি যখন ৪৯তম বছরে পা রাখতে যাচ্ছে, তখন এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায়কে ফিরে দেখার সময়। এটি প্রশ্ন করার সময় কীভাবে একটি দল এত উত্থান-পতন, সংকট, শোক, বিভাজন ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজও দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে? হয়তো এর উত্তর খুঁজতে গেলে সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতীকগুলোর একটি হলো- ফিনিক্স।
কিংবদন্তির সেই পাখি, যে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়; কিন্তু তার গল্প সেখানে শেষ হয় না। ছাই থেকেই জন্ম নেয় তার নতুন জীবন। ফিনিক্সের শক্তি তার কখনো না মরার মধ্যে নয়; তার শক্তি হলো ধ্বংসের পরও পুনর্জন্মের ক্ষমতা। বিএনপির ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলাও যেন অনেকাংশে সেই গল্পের রাজনৈতিক প্রতিচ্ছবি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ৪৯তম বছরে বিএনপি কি শুধু ফিরে এসেছে, নাকি সত্যিই নতুন করে জন্ম নিচ্ছে?
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এমন এক সময়ে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন, যখন বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন পরিচয়, নতুন রাজনৈতিক কাঠামো এবং বহুদলীয় অংশগ্রহণের প্রশ্নে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। বিএনপির নিজস্ব ইতিহাসে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল রাষ্ট্রকে জনগণের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার চিন্তা। তাঁর রাজনীতিতে গ্রাম, কৃষি, উৎপাদন, শ্রম, আত্মনির্ভরতা এবং জাতীয় স্বার্থ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।
তিনি এমন এক রাজনৈতিক দর্শন সামনে আনতে চেয়েছিলেন, যেখানে বাংলাদেশের পরিচয় তার নিজস্ব ভূগোল, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মমর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত হবে। এখানেই বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের মূল শক্তি।
একটি দল কেবল নির্বাচনী প্রতীক দিয়ে বড় হয় না। একটি দল বড় হয় যখন তার পেছনে একটি রাজনৈতিক ধারণা থাকে, একটি রাষ্ট্রদর্শন থাকে এবং মানুষের কাছে ভবিষ্যতের একটি কল্পনা থাকে। বিএনপির জন্মের পেছনে সেই কল্পনা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা এবং তাকে প্রায় পাঁচ দশক ধরে টিকিয়ে রাখা এক বিষয় নয়। এখানেই বিএনপির ইতিহাস অন্যরকম।
৪৮ বছরের বিএনপির ইতিহাস একরৈখিক নয়। এই ইতিহাসে আছে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনার অভিজ্ঞতা, নির্বাচনী সাফল্য, রাজনৈতিক পরাজয়, আন্দোলন, শোক এবং দীর্ঘ প্রতিকূলতা। একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলে তার শক্তি দৃশ্যমান হয় রাষ্ট্র পরিচালনায়। কিন্তু ক্ষমতার বাইরে গেলে তার প্রকৃত সাংগঠনিক ভিত্তির পরীক্ষা শুরু হয়। সেই পরীক্ষায় বিএনপিকে দীর্ঘ সময় পার করতে হয়েছে।
এমন সময়ও এসেছে, যখন দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিএনপি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। বলা হয়েছে, সংগঠন ভেঙে পড়েছে। নেতৃত্বের সংকট নিয়ে নানা বিশ্লেষণ হয়েছে। রাজনৈতিক মাঠ সংকুচিত হওয়ার বাস্তবতায় অনেকেই বিএনপির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু রাজনীতির একটি কঠিন সত্য হলো কোনো রাজনৈতিক শক্তির অস্তিত্ব শুধু তার কার্যালয়, পদ-পদবি কিংবা ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। তার শক্তি নির্ভর করে মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের ওপর।
একটি দলকে প্রশাসনিকভাবে চাপে রাখা যেতে পারে, তার নেতাদের কারাবন্দি করা যেতে পারে, কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত করা যেতে পারে কিন্তু মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে চিরদিন নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
বিএনপির পুনরুত্থানের আলোচনায় এই বাস্তবতাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি দল যখন দীর্ঘ প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকে, তখন বুঝতে হয় তার শিকড় কেবল ক্ষমতার করিডোরে নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরেও বিস্তৃত। ফিনিক্সের গল্প এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আগুন তাকে শেষ করে না। আগুন তার পরবর্তী জন্মের পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়ায়।
বিএনপির ইতিহাস বলতে গেলে জিয়াউর রহমানকে বাদ দিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা নন; তিনি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের নির্মাতা। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাকে তিনি রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কারা? আমাদের রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি কী? স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার রাজনৈতিক অর্থ কী? জিয়াউর রহমান এই প্রশ্নগুলোর একটি ভিন্ন রাজনৈতিক উত্তর দিয়েছিলেন। বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দর্শনের সঙ্গে বহুদলীয় গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য এবং আত্মনির্ভর অর্থনীতির ধারণাকে যুক্ত করা হয়েছে। তবে একজন রাজনৈতিক নেতার প্রকৃত উত্তরাধিকার শুধু তার স্মৃতিচারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে যায়। উত্তরাধিকার তখনই শক্তিশালী হয়, যখন পরবর্তী প্রজন্ম সেই দর্শনকে নতুন সময়ের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে।
৪৯তম বছরে বিএনপির জন্য এটাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জিয়ার দর্শনকে শুধু স্লোগানে নয়, একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে কার্যকর নীতিতে রূপান্তর করতে হবে। আজ আত্মনির্ভরতার অর্থ কী? আজ জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অর্থ কী? আজ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের অর্থ কী? ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের যুগে বিএনপি যদি এই প্রশ্নগুলোর আধুনিক উত্তর দিতে পারে, তবেই প্রতিষ্ঠাতার দর্শন সত্যিকার অর্থে নতুন জীবন পাবে।
বিএনপির ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহৎ অধ্যায়ের নাম বেগম খালেদা জিয়া। একটি দলের ইতিহাসে এমন কিছু নেতৃত্ব থাকে, যারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু ব্যক্তি থাকেন না; তারা একটি রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত হন। খালেদা জিয়া বিএনপির জন্য তেমনই একটি নাম। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা ইতিহাসের অংশ। কিন্তু বিএনপির অভ্যন্তরীণ ইতিহাসে তাঁর গুরুত্ব আরও গভীর। স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেই বাস্তবতায় তিনি ধীরে ধীরে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং দলটিকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ধরে রাখেন। রাজনীতির কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া সহজ নয়। বিশেষ করে যখন একটি দলের সামনে থাকে রাষ্ট্রীয় চাপ, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং সাংগঠনিক সংকট। খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত ধৈর্য। তিনি বিএনপির জন্য শুধু নেতৃত্ব নন; তিনি প্রতিরোধের এক মানসিক শক্তি। রাজনীতিতে কখনো কখনো বক্তৃতার চেয়ে নীরবতা শক্তিশালী হয়। কখনো কখনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন সেই দীর্ঘ সংগ্রামেরই একটি প্রতীক।
৪৯তম বছরে বিএনপির সামনে যে নতুন রাজনৈতিক যাত্রা, তার নেতৃত্বের প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই নতুন গুরুত্ব বহন করছে। একটি দলের জন্য নেতৃত্বের পরিবর্তন কেবল ব্যক্তি পরিবর্তন নয়। এটি রাজনৈতিক ভাষা পরিবর্তনেরও সুযোগ। আজকের বাংলাদেশ বদলে গেছে। আজকের তরুণরা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান শুনতে চায় না। তারা জানতে চায় আমার কর্মসংস্থান কোথায়? মানসম্মত শিক্ষা কীভাবে পাব? দুর্নীতি কমবে কীভাবে? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা কীভাবে নিশ্চিত হবে? রাজনীতি কি আমার জন্য নিরাপদ হবে? যোগ্যতা কি পরিচয়ের চেয়ে বেশি মূল্য পাবে?বিষ্যতের নিশ্চয়তার প্রশ্ন।
এই জায়গাতেই তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। জনপ্রিয়তা অর্জন করা এক বিষয়। কিন্তু জনপ্রিয়তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতায় রূপান্তর করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ৪৯তম বছরে বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা শুধু একটি শক্তিশালী আন্দোলনের দল নয়; তারা একটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রস্তুত রাজনৈতিক শক্তি।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ফিনিক্সের পুনর্জন্ম মানে পুরোনো জীবনে ফিরে যাওয়া নয়। পুনর্জন্ম মানে নতুন জীবন। বিএনপির জন্যও ৪৯তম বছরে সবচেয়ে বড় ভুল হবে যদি তারা মনে করে পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোতেই ভবিষ্যতের সব উত্তর রয়েছে।
বাংলাদেশ বদলেছে। মানুষের প্রত্যাশা বদলেছে। রাজনীতির ভাষা বদলেছে। বিশ্ব বদলেছে।সুতরাং বিএনপিকেও বদলাতে হবে। এই পরিবর্তন অবশ্যই আদর্শ বিসর্জনের পরিবর্তন নয়। বরং মূল আদর্শকে সময়োপযোগী করে তোলার পরিবর্তন।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে আজকের প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। গণতন্ত্রকে শুধু নির্বাচন দিয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিষ্ঠানগত জবাবদিহিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। জাতীয় স্বার্থের কথা বলার পাশাপাশি বৈশ্বিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের বাস্তব সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলার পাশাপাশি বৈষম্য, বেকারত্ব এবং দক্ষতা উন্নয়নের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। এটাই হবে প্রকৃত পুনর্জন্ম।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর যেকোনো দলের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে তখন, যখন তাকে ভবিষ্যতের দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত হতে হয়।আন্দোলনের রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনীতি এক নয়। আন্দোলনে আবেগ প্রয়োজন। রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রয়োজন পরিকল্পনা। আন্দোলনে স্লোগান মানুষকে একত্রিত করে। রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রয়োজন দক্ষ প্রতিষ্ঠান। আন্দোলনে প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করা সহজ।রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো সবার জন্য ন্যায়সঙ্গত কাঠামো তৈরি করা।
বিএনপির সামনে এখন এই রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ। দলটির ৪৯তম বছরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত আমরা কীভাবে ক্ষমতায় যাব? এর চেয়েও বড় প্রশ্ন আমরা ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশকে কীভাবে বদলাব? এই দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরই বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম তরুণ জনসংখ্যার দেশ। এই তরুণদের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ আছে, কিন্তু একই সঙ্গে হতাশাও আছে। তারা রাজনৈতিক সহিংসতা দেখতে চায় না। তারা চাঁদাবাজির রাজনীতি দেখতে চায় না। তারা পদ দখলের রাজনীতি দেখতে চায় না। তারা দেখতে চায় যোগ্যতার রাজনীতি। বিএনপি যদি সত্যিই ফিনিক্সের মতো নতুন করে জন্ম নিতে চায়, তবে তরুণদের শুধু মিছিলের শক্তি হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের নীতিনির্ধারণে জায়গা দিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী তরুণ, প্রযুক্তিবিদ, চিকিৎসক, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং সমাজকর্মীদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করার নতুন কাঠামো তৈরি করতে হবে। রাজনীতি যেন শুধু পেশাদার রাজনীতিবিদদের একচেটিয়া ক্ষেত্র না থাকে। নতুন বিএনপির সবচেয়ে বড় পরিচয় হতে পারে মেধা, সততা এবং তারুণ্যের সমন্বয়।
যে দল আত্মসমালোচনা করতে পারে না, সে দল দীর্ঘদিন নতুন থাকতে পারে না। বিএনপিরও ভুল ছিল। সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল। অনেক সময়ে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি ছিল। নেতৃত্ব ও তৃণমূলের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক রাজনীতি সংগঠনের আদর্শিক শক্তিকে দুর্বল করেছে। এই বাস্তবতাগুলো স্বীকার করাই দুর্বলতা নয়। বরং আত্মসমালোচনার মধ্যেই নতুন শক্তির জন্ম হয়। ফিনিক্সের পুনর্জন্মের আগে আগুন লাগে। রাজনীতির ভাষায় সেই আগুন কখনো কখনো আত্মসমালোচনা। যে দল নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তাকে পরাজিত করা কঠিন।
বিএনপির ৪৯তম বছরে পদার্পণ তাই শুধু আনন্দের মুহূর্ত নয়। এটি দায়িত্বের মুহূর্ত। এই মুহূর্তে বিএনপির প্রয়োজন কয়েকটি সুস্পষ্ট অঙ্গীকার। প্রথমত, গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠানগতভাবে শক্তিশালী করার অঙ্গীকার। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের বাইরে রাখার অঙ্গীকার। তৃতীয়ত, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতির অঙ্গীকার। চতুর্থত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাইরে এনে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করার অঙ্গীকার। পঞ্চমত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাস্তব ও কার্যকর অবস্থানের অঙ্গীকার। ষষ্ঠত, প্রতিহিংসার পরিবর্তে রাজনৈতিক সহনশীলতার অঙ্গীকার। এবং সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশ সবার এই বিশ্বাসকে বাস্তব রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার।
ফিনিক্সের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তার ধ্বংস নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হলো সে যখন আবার আকাশে ডানা মেলে। বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসে সংগ্রাম আছে। গৌরব আছে। বেদনা আছে। ভুল আছে। সাফল্য আছে। শোক আছে। পুনরুত্থানও আছে।
কিন্তু ৪৯তম বছরে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অতীত নিয়ে নয় ভবিষ্যৎ নিয়ে। বিএনপি কি অতীতের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে থাকবে? নাকি অতীতের অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে পরিণত করে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণ করবে? আজ বিএনপির সামনে যে সুযোগ এসেছে, তা কেবল রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ নয়। এটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরির সুযোগ। একটি এমন রাজনীতি, যেখানে প্রতিপক্ষ মানেই শত্রু নয়। যেখানে রাষ্ট্র মানেই দল নয়। যেখানে ক্ষমতা মানেই প্রতিশোধ নয়। যেখানে তরুণ মানেই শুধু মিছিলের কর্মী নয়, বরং নীতিনির্ধারক। যেখানে জাতীয়তাবাদ মানে অন্যকে বাদ দেওয়া নয়, বরং নিজের দেশকে শক্তিশালী করা।
যেখানে গণতন্ত্র শুধু ভোটের দিনের ঘটনা নয়, বরং প্রতিদিনের রাষ্ট্রীয় আচরণ। ফিনিক্সের পুনর্জন্ম তাই কেবল ছাই থেকে ফিরে আসার গল্প নয়। এটি আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসার গল্প। বিএনপির জন্যও ৪৯তম বছর হতে পারে ঠিক তেমন একটি অধ্যায়ের সূচনা। ৪৮ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে, সংগ্রামের স্মৃতি বুকে ধারণ করে, শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে এবং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপিকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কেমন বাংলাদেশ দেখতে চায়।
কারণ ইতিহাস কাউকে শুধু অতীতের জন্য স্মরণ করে না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মনে রাখে কে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পেরেছিল। ৪৯তম বছরে বিএনপির নতুন রাজনৈতিক যাত্রার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা এখানেই। ছাই থেকে উঠে দাঁড়ানো যথেষ্ট নয়। এবার প্রয়োজন নতুন আকাশে নতুন ডানা মেলার। আর সেই যাত্রার নামই হতে পারে ফিনিক্সের পুনর্জন্ম।
ডাঃ এ, কে, এম আহসান হাবীব নাফি
চিকিৎসক ও রাজনৈতিক কর্মী
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, কমনওয়েলথ স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন
