বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও আগামীর বাংলাদেশ ভাবনা

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৩ পিএম

আজ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, গৌরব, ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্যের ৪৮টি বছর পূর্ণ করলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৯৭৮ সালের এই দিনে ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁ প্রাঙ্গণে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে দলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম)। প্রায় অর্ধশতাব্দীর এই পথচলায় দলটি বহু চড়াই-উতরাই, দীর্ঘ রাজপথের সংগ্রাম, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে। দীর্ঘ দুই দশক পর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান উত্তর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠনের পর, এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলটির জন্য এক নতুন যুগান্তকারী মাইলফলক।

বিএনপির রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ঘোষিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। এই দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা গোত্র নির্বিশেষে এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের অনন্য ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করা। শহীদ জিয়া বিশ্বাস করতেন, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন আত্মনির্ভরশীলতা। তাঁর প্রবর্তিত ঐতিহাসিক ‘১৯ দফা কর্মসূচি’ ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, জনশক্তি উন্নয়ন, নারীর সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে দুর্নীতি দূরীকরণের এক কালজয়ী ইশতেহার। তাঁর দর্শন কেবল তাত্ত্বিক ছিল না, বরং তা ছিল দেশের মাটি ও মানুষের আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া এক বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মপরিকল্পনা।

তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের দুয়ার উন্মোচন করে জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কূটনীতির সূচনা করেছিলেন। আজকের বিশ্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এটি দেশের টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। এই জাতীয়তাবাদ দেশের নিজস্ব সম্পদ, প্রবাসী আয় এবং দেশীয় শিল্পের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে এনে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে পারে। শহর ও গ্রামের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে তৃণমূলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখে। ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা মোকাবিলা করে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চে স্থান দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার পাশাপাশি বিচার বিভাগ, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয়করণের ঊর্ধ্বে তুলে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক হিসেবে গড়ে তোলাই এই জাতীয়তাবাদের লক্ষ্য। বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বিএনপির সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর টেকসই রূপান্তর ঘটানো।

দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ৩১-দফা সংস্কার প্রস্তাবনা ঘোষণা করেছে। আগামী ভবিষ্যতে বিএনপির কাজের মূল ফোকাস হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করা, যাতে জনগণের ভোটাধিকার আর কখনো হরণ না হয়। তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইটি খাতের বিকাশ এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের এই মুহূর্তে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের জন্য আত্মশুদ্ধি এবং আদর্শিক দৃঢ়তা প্রদর্শনের এক পরম সুযোগ। দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ে শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখতে নেতাকর্মীদের বিনয় ও জনসম্পৃক্ততা বজায় রাখতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই অহমিকা প্রদর্শন করা যাবে না।

নেতাকর্মীদের জনগণের সেবক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে হবে এবং দলের ভেতরে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, দখলবাজি কিংবা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আপসহীন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শহীদ জিয়া ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আজীবনের ত্যাগ ও আপসহীন সংগ্রামকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে দলকে স্থান দিতে হবে। প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তি, মেধা এবং পরমতসহিষ্ণুতার ভিত্তিতে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। প্রতিষ্ঠার প্রায় অর্ধশতাব্দী পর, বিএনপি আজ এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে। শহীদ জিয়ার রেখে যাওয়া বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মশালকে বুকে ধারণ করে, বেগম খালেদা জিয়ার আজীবন আপসহীন সংগ্রামকে পাথেয় করে এবং তারেক রহমানের আধুনিক ও তারুণ্যদীপ্ত দূরদর্শিতাকে সঙ্গী করে বিএনপি একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে সফল হবে। ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই হোক এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

ইমতিয়াজ আহমেদ পিয়াস
প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইয়ুথ থিংকট্যাঙ্ক

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন