রাষ্ট্রপতি কি শুধুই ‘ইয়েসম্যান’?

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৯:২১ পিএম

রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতির মর্যাদা সংবিধানে দেশের সবার ওপরে। ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনকালে তাকে ফৌজদারি বিচারের আওতায় আনা যায় না। কিন্তু বাস্তবে এই পদটি এখন কেবল অনুমোদনদাতা বা ‘ইয়েসম্যান’-এ পরিণত হয়েছে।

বিশ্বাস করা কঠিন হলেও সত্য, সংসদে ভাষণের সময় রাষ্ট্রপতি নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হারিয়েছেন। নতুন সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন হোক কিংবা নতুন বছরের প্রথম অধিবেশন-রাষ্ট্রপতি আসলে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার অনুমোদিত বক্তব্যই পড়েন।

এই নিয়ন্ত্রণের সূত্রপাত ১৯৯৬ সালে। সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের কার্যবিধিতে সংশোধন এনে একটি নতুন বিধান যুক্ত করেন। এতে বলা হয়, সংসদ ও মন্ত্রিসভার উদ্দেশে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বার্তা মন্ত্রিসভা অনুমোদন করবে। এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল তখনকার রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে লক্ষ্য করে, যিনি আগের সংসদে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৯১ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রথম পাঁচ বছরে রাষ্ট্রপতিরা সংসদে নিজেদের ভাষণ দেওয়ার স্বাধীনতা পেতেন। ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে বাধ্য হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের কাঙ্ক্ষিত ভাষণ পড়তে হয়। সেই থেকে এই ধারা চলছে।

২০০১ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের বড় পরাজয়ের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। আবদুর রহমান বিশ্বাসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তার সরকার সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি করে। নৈতিক দৃঢ়তা ও স্পষ্টভাষীর জন্য পরিচিত সাহাবুদ্দীন আহমদ সরকারের সব সিদ্ধান্তে নির্বিকার সম্মতি দেননি। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনের পর গঠিত অষ্টম সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে তাঁর দেওয়া ভাষণে আওয়ামী লীগের তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সেই ভাষণ আসলে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা প্রস্তুত করেছিল।

এরপর একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতির ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা করলেও ২০০২ সালের জুনে মাত্র সাত মাসের মাথায় বঙ্গভবন ছাড়তে বাধ্য হন। তার পর থেকে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, জিল্লুর রহমান ও আবদুল হামিদ-সবাই ছিলেন মূলত ‘ইয়েসম্যান’।

বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিলে দায়িত্ব নেন। শেখ হাসিনা সরকারের একতরফা নির্বাচনের পর তিনি পদত্যাগ করবেন কি না-এ নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ক্ষমতাসীন দল চাইলে তিনি মেয়াদ পূর্ণ করবেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে অস্থির পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তাকে বঙ্গভবন থেকে সরানোর চেষ্টা হয়েছিল এবং সে সময় সেনাবাহিনী ও বিএনপি তাঁর পাশে ছিল।

এখন সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে সরকারের নীতিনির্ধারক ও বিএনপি নেতৃত্বের ওপর-তারা রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে মেয়াদ শেষ করতে দেবেন, নাকি আগেই সরিয়ে দেবেন। যদি তাকে সরানো হয়, তাহলে সেটি আবারও প্রমাণ করবে যে এই পদে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান-কোনোটিই গুরুত্ব পায় না।

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন