রাষ্ট্র সংস্কারে ক্ষমতার ভারসাম্য: সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব

মাহাদী-উল-মোর্শেদ
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি শুধু নির্বাচনের মধ্যেই নিহিত নয় বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কীভাবে বণ্টিত, নিয়ন্ত্রিত এবং জবাবদিহির আওতায় থাকে তার ওপরও গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব নির্ভর করে। আইন প্রণয়ন, নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিচারিক তদারকির মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য না থাকলে নির্বাচিত সরকারও ধীরে ধীরে অতিরিক্ত ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এই নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো checks and balances। অর্থাৎ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেন পরস্পরের ক্ষমতার ওপর প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।

মন্টেস্কুর ক্ষমতার পৃথকীকরণ তত্ত্ব এই আলোচনার একটি ক্লাসিক ভিত্তি। তাঁর যুক্তির সারকথা ছিল, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যদি একটি মাত্র কেন্দ্রের হাতে অতিরিক্তভাবে কেন্দ্রীভূত হয়, তবে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকি তৈরি হয় (Montesquieu, 1748/1989)। আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রে তাই সংসদ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে দায়িত্বের বিভাজন এবং পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণকে গণতান্ত্রিক শাসনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানেও বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখার নীতির সরাসরি স্বীকৃতি রয়েছে। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে বিচার বিভাগকে নির্বাহী অঙ্গ থেকে পৃথক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে Anwar Hossain Chowdhury v. Bangladesh এবং Secretary, Ministry of Finance v. Masdar Hossain মামলাগুলো ক্ষমতার সীমা, সাংবিধানিক মৌলিক কাঠামো এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার আলোচনায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সাংবিধানিক কাঠামো কাগজে থাকা এবং বাস্তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কার্যকর থাকা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, সংসদীয় দলের অভ্যন্তরে স্বাধীন মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা এবং বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নটি এখন কেবল আইনজ্ঞ বা রাজনীতিবিদদের আলোচনার বিষয় নয় এটি সাধারণ নাগরিকের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ও রাষ্ট্র-সম্পর্কিত প্রত্যাশারও প্রশ্ন।

এই প্রেক্ষাপটেই সেন্টার ফর রিসার্চ ইন মাল্টিডিসিপ্লিন (সিআরএম) – এর অধীনে পরিচালিত একটি জরিপে ৪৪৮টি বৈধ উত্তর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতি নাগরিকদের মনোভাব বোঝা। ফলাফলটি বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে চলমান আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইঙ্গিত দেয়।

৯২.৪ শতাংশের সমর্থনঃ ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে একটি স্পষ্ট জনমত

জরিপে উত্তরদাতাদের কাছে রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বিচার বিভাগের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা থাকা উচিত কি না, সে বিষয়ে মতামত নেওয়া হয়।

৪৪৮ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৭৪.৮ শতাংশ ‘Agree’ এবং ১৭.৬ শতাংশ ‘Strongly Agree’ করেছেন। অর্থাৎ মোট ৯২.৪ শতাংশ উত্তরদাতা ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছেন।

এই ফলাফলটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের ৯২.৪ শতাংশ মানুষ একই মত পোষণ করেন। বরং আরও যথাযথভাবে বলা যায় এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৪৪৮ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৯২.৪ শতাংশ ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। নমুনার প্রতিনিধিত্বশীলতা ও নমুনা নির্বাচনের পদ্ধতি বিবেচনা না করে এই ফলাফলকে পুরো দেশের জনসংখ্যার ওপর সরাসরি সাধারণীকরণ করা উচিত নয়।

তবু ফলাফলটি একটি শক্তিশালী সামাজিক সংকেত বহন করেঃ গবেষণায় অংশ নেওয়া নাগরিকদের বড় অংশ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রত্যাশা করেন যেখানে কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা ক্ষমতাকেন্দ্র অতিরিক্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠবে না।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের দিকে তাকালেও এই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সংযোগ পাওয়া যায়। ১৯৮৯ সালের Anwar Hossain Chowdhury v. Bangladesh মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সাংবিধানিক মৌলিক কাঠামোর ধারণাকে গুরুত্ব দেয় এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক কাঠামোর মৌলিক বৈশিষ্ট্য রক্ষার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করে। (Ahmed, 2018)।

অন্যদিকে, ১৯৯৯ সালের Secretary, Ministry of Finance v. Masdar Hossain মামলাটি অধস্তন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচারিক কার্যক্রম পৃথক করার প্রশ্নে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ, সাংবিধানিক আদালতের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার প্রশ্ন এবং বর্তমান জরিপে নাগরিকদের প্রকাশিত প্রত্যাশার মধ্যে একটি ধারণাগত সাদৃশ্য রয়েছে।

তরুণরা কেন পরিবর্তনের প্রতি বেশি ইতিবাচক?

এই গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য ফল হলো বয়সের সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্যের সমর্থনের ঋণাত্মক সম্পর্ক পাওয়া গেছেঃ r = -.227, p < .01। সহজ ভাষায়, গবেষণার এই নমুনায় বয়স বাড়ার সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য ও সংস্কারের প্রতি সমর্থন তুলনামূলকভাবে কমেছে। বিপরীতে অপেক্ষাকৃত তরুণ উত্তরদাতাদের মধ্যে সমর্থন বেশি ছিল। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই correlation থেকে বলা যায় না যে বয়স কম হওয়ার কারণেই কেউ সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেন। বরং বলা যায়, বয়স এবং সংস্কার-সমর্থনের মধ্যে একটি পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

এই সম্পর্কের সম্ভাব্য সামাজিক ব্যাখ্যা হতে পারে প্রজন্মগত অভিজ্ঞতা। তরুণরা তুলনামূলকভাবে বেশি ডিজিটাল, তথ্যনির্ভর এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সংযুক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদ, আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক নাগরিক আলোচনার কারণে তারা রাষ্ট্র, অধিকার, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণের নতুন ধারণার সঙ্গে দ্রুত পরিচিত হচ্ছে। তবে তরুণদের মনোভাবকে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করাও যথেষ্ট নয়। শিক্ষাগত অভিজ্ঞতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যাশাও তাদের রাষ্ট্র-সম্পর্কিত মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে।

শিক্ষাঃ সচেতনতা, অধিকার ও রাষ্ট্রের প্রতি প্রত্যাশা

শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে উত্তরদাতাদের মধ্যে সংস্কার-সমর্থনের পার্থক্যও পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিলঃ Kruskal–Wallis (χ²) = 80.823, p < .001। এর অর্থ হলো, বিভিন্ন শিক্ষাগত গোষ্ঠীর সংস্কার-সমর্থনের বণ্টনে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। গবেষণায় অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের উত্তরদাতাদের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল যথাক্রমে ২৯.৭ শতাংশ এবং ২৩.০ শতাংশ। অর্থাৎ ৫২.৭% উচ্চশিক্ষিত লোক মতামত দিয়েছেন। তাই বলা যায় রাষ্ট্র সংস্কারে সাধারণ জনগণের আগ্রহ বেশ।

তবু শিক্ষার সঙ্গে রাজনৈতিক সচেতনতার সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। শিক্ষা সাধারণত রাজনৈতিক তথ্যপ্রাপ্তি, অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান এবং রাজনৈতিক কার্যকারিতার অনুভূতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে (Willeck & Mendelberg, 2022)। এই গবেষণার ফলাফল সেই বৃহত্তর আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সম্ভাব্য দিক নির্দেশ করে।

পেশাগত অবস্থানঃ উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীদের অবস্থান

পেশাগত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও সংস্কার-সমর্থনের পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিলঃ Kruskal–Wallis χ² = 88.849, p < .001। গবেষণার নমুনায় উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য যথাক্রমে ৩৫.৫ শতাংশ এবং ৩৩.৯ শতাংশ। উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, লাইসেন্সিং, করব্যবস্থা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, চুক্তির নিরাপত্তা ও আইনের পূর্বানুমানযোগ্যতা সরাসরি অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। তাই একজন উদ্যোক্তার কাছে কার্যকর রাষ্ট্র মানে শুধু শক্তিশালী সরকার নয় বরং এমন একটি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ব্যবস্থা, যেখানে নিয়ম একইভাবে প্রয়োগ হবে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহিতা থাকবে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ নাগরিক ও ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাষ্ট্রের বর্তমান কাঠামো তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক গতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে তাদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতি আগ্রহ থাকা সামাজিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

ধর্ম ও সামাজিক শ্রেণী বিভাজনের বাইরে একটি অভিন্ন প্রত্যাশা?

ধর্মীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে ফলাফল ছিল সীমান্তবর্তীঃ χ² = 7.822, p = .050। অন্যদিকে সামাজিক শ্রেণির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি: χ² = 0.643, p = .422।
এই ফলাফল একটি আকর্ষণীয় প্রশ্ন সামনে আনে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের প্রশ্নটি কি ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি নাগরিক প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে? এই গবেষণার ফলাফল অন্তত নমুনার পর্যায়ে এমন একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, নাগরিকরা ভিন্ন ধর্ম, শ্রেণি বা সামাজিক পরিচয়ের হলেও আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কিছু অভিন্ন প্রত্যাশা পোষণ করতে পারেন।

রিগ্রেশন মডেলঃ একাধিক সামাজিক উপাদান একসঙ্গে বিবেচনায়

গবেষণার multiple linear regression model-এ বয়স, শিক্ষা, আয়, সামাজিক শ্রেণিসহ একাধিক ভেরিয়েবল একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। মডেলটি সংস্কার-সমর্থনের মোট variance-এর ৪০.৭ শতাংশ ব্যাখ্যা করেছে (R² = .407) এবং সামগ্রিকভাবে মডেলটি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, F(7, 440) = 43.127, p < .001। এটি গবেষণার একটি শক্তিশালী ফল। কারণ, একক কোনো সামাজিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্ক দেখার পরিবর্তে একাধিক বৈশিষ্ট্য একই মডেলের মধ্যে বিবেচনা করা হয়েছে।

রিগ্রেশন বিশ্লেষণে socioeconomic status-এর standardized coefficient ছিল β = .586, p < .001, এবং education-এর coefficient ছিল β = .550, p < .001। অন্যদিকে family income-এর coefficient ছিল β = -.512, p < .001, এবং age-এর coefficient ছিল β = -.311, p < .001। এই ফলাফল থেকে দেখা যায়, অন্যান্য ভেরিয়েবল নিয়ন্ত্রণ করার পর socioeconomic status এবং education সংস্কার-সমর্থনের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত ছিল বিপরীতে income এবং age-এর coefficient নেতিবাচক ছিল। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানগত সতর্কতা অপরিহার্য। β মানে সরাসরি “কারণ” নয়। তাই socioeconomic status-কে “সংস্কারের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি” বলা causal অর্থ তৈরি করতে পারে। গবেষণাটি cross-sectional হওয়ায় আরও যথাযথ ভাষা হবে “সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থান সংস্কার-সমর্থনের একটি শক্তিশালী statistical predictor ছিল।”

তাহলে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব কী বলছে?

এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি সম্ভবত একটি সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। ৯২.৪ শতাংশের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে যে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত নাগরিকদের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্যকে কেবল সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক তত্ত্ব হিসেবে দেখছেন না বরং এটিকে একটি কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করছেন। মনস্তাত্ত্বিকভাবে এর পেছনে থাকতে পারে ন্যায্যতার প্রত্যাশা, রাজনৈতিক কার্যকারিতার অনুভূতি, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা। একজন নাগরিক যখন মনে করেন যে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হবে, আদালত স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং সরকার তার সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি করবে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তার perceived legitimacy বা বৈধতার অনুভূতি বাড়তে পারে। অন্যদিকে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে, নাগরিকের রাজনৈতিক কার্যকারিতা বা “আমার মতামতের মূল্য আছে” এই অনুভূতি দুর্বল হতে পারে।

সুতরাং ক্ষমতার ভারসাম্য কেবল একটি সাংবিধানিক নকশা নয়; এটি নাগরিকের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

নীতি-নির্ধারকদের জন্য চারটি বার্তাঃ

১. ক্ষমতার ভারসাম্যকে সাংবিধানিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখাঃ

গবেষণায় অংশ নেওয়া নাগরিকদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাই রাষ্ট্র সংস্কারের যেকোনো আলোচনায় সংসদের কার্যকর ভূমিকা, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদিহিতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

২. তরুণদের শুধু ভোটার নয়, নীতিনির্ধারণের অংশীদার হিসেবে দেখাঃ

তরুণ বয়সের সঙ্গে সংস্কার-সমর্থনের নেতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক না রেখে policy consultation, youth parliament, civic education এবং public deliberation-এর মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের যুক্ত করা যেতে পারে।

৩. নাগরিক ও সাংবিধানিক শিক্ষা বাড়ানোঃ

সংবিধান, নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার পৃথকীকরণ সম্পর্কে সহজবোধ্য নাগরিক শিক্ষা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী করতে পারে।

৪. উদ্যোক্তা ও তরুণ কর্মশক্তির জন্য পূর্বানুমানযোগ্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করাঃ

ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের পরিবেশ শুধু অর্থনৈতিক নীতির ওপর নির্ভর করে না; বরং আইনের স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং চুক্তির নিরাপত্তার ওপরও নির্ভর করে। তাই রাষ্ট্র সংস্কারকে অর্থনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা উচিত নয়।

শেষ কথাঃ মানুষ আসলে কেমন রাষ্ট্র চায়?

রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে প্রায়ই ব্যক্তি, দল ও ক্ষমতার সমীকরণ সামনে চলে আসে। কিন্তু এই গবেষণার ফলাফল আলোচনাটিকে অন্য একটি জায়গায় নিয়ে যায় প্রতিষ্ঠান বনাম ব্যক্তি। একটি টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এমন হওয়া উচিত যেখানে ব্যক্তি পরিবর্তিত হলেও প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকবে; সরকার পরিবর্তিত হলেও আইনের শাসন অটুট থাকবে; সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও জবাবদিহিতা থাকবে; এবং নির্বাহী ক্ষমতা থাকলেও তা সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থাকবে।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসেও এই ধারণার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে। Anwar Hossain Chowdhury মামলার মৌলিক কাঠামো-সংক্রান্ত অবস্থান এবং Masdar Hossain মামলার বিচারিক স্বাধীনতার প্রশ্ন দেখায় যে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক ভারসাম্য কোনো নতুন ধারণা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিকাশের দীর্ঘ আলোচনার অংশ। আজকের ৪৪৮ জন উত্তরদাতার জরিপ সেই বৃহত্তর আলোচনায় একটি সমসাময়িক নাগরিক-দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করেছে।

তবে গবেষণার ফলাফলকে দায়িত্বশীলভাবে পড়তে হবে। এটি একটি cross-sectional survey, এবং ৪৪৮ জনের নমুনা থেকে পুরো বাংলাদেশের জনগণের মতামত সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না। একইভাবে correlation বা regression association দেখায়; causal relationship প্রমাণ করে না। ভবিষ্যতে বৃহত্তর ও probability-based national sample, longitudinal design এবং qualitative interviews যুক্ত করা হলে রাষ্ট্র সংস্কার সম্পর্কে বাংলাদেশের নাগরিক মনস্তত্ত্ব আরও নির্ভুলভাবে বোঝা সম্ভব হবে।

তারপরও একটি বিষয় পরিষ্কারঃ গবেষণায় অংশ নেওয়া নাগরিকদের বিপুল অংশ এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামোর প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন যেখানে ক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রতিষ্ঠাননির্ভর যেন থাকে।

রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই “একজন শক্তিশালী শাসক নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা”।

মাহাদী-উল-মোর্শেদ
গবেষক ও পলিসি এনালিস্ট

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর