নীতিহীনতার চোরাবালিতে তরুণ সমাজ, উত্তরণের পথ কোথায়?

বাংলাদেশ চিত্র
প্রকাশ : ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৮ পিএম

আমাদের স্কুলজীবনের ইসলাম শিক্ষার স্যারকে আমরা অনেকেই ভালোবেসে ‘হুজুর’ বলে ডাকতাম। আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, তিনি শুধু ধর্মের শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন জীবনের এক সরল ও উজ্জ্বল বাতিঘর। তাঁর সিলেবাস ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু জীবনের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলতেন, “ঠিকঠাক নামাজ পড়বি, মিথ্যা বলবি না, বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করবি আর অন্যের ক্ষতি হয় এমন কিছু করবি না ব্যাস, এটুকু করলেই হবে।” ক্লাসে বসা হিন্দু বা খ্রিষ্টান সহপাঠীদেরও নিজ ধর্মের বই খুলতে বলে পরম স্নেহে একই কথা বলতেন তিনি। কৌতূহলী হয়ে যখন জিজ্ঞেস করতাম, “হুজুর, তাহলে সত্যি কোনটা?” তিনি হেসে উত্তর দিতেন, “যার যার কাছে তার চিন্তাভাবনা আর রীতিনীতি সত্যি। শুধু মাথায় রাখবি, তোর কোনো কথায় যেন বন্ধু-বান্ধবীরা কষ্ট না পায়। একে অপরকে সম্মান করবি। তোরা সবাই শুধু ভালো মানুষ হ; এটাই আমি দোয়া করি।”

কী অদ্ভুত এক সর্বজনীন মানবিক শিক্ষা! অথচ আজকের চারপাশের সমাজটার দিকে তাকালে গা শিউরে ওঠে। কম্পিউটারে ভাইরাস ঢুকে যেমন পুরো সিস্টেম অচল করে দেয়, তেমনি আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে এক নতুন ধরনের ‘ভাইরাস’। আজকের তরুণ ও যুবসমাজের বড় একটি অংশের দিকে তাকালে চরম অস্থিরতা চোখে পড়ে। সহনশীলতা শব্দটা যেন তাদের অভিধান থেকে হারিয়ে গেছে। চারদিকে নৈতিক শিক্ষার চরম অবক্ষয়। সামান্য কারণে বড়দের সাথে বেয়াদবি, আর কথায় কথায় কুরুচিপূর্ণ বা অশ্লীল ভাষার ব্যবহার এখন এক শ্রেণির তরুণের কাছে ‘স্মার্টনেস’-এর মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ‘মব জাস্টিস’ বা দলবদ্ধ আক্রমণ। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, কাউকে সন্দেহ হলেই দল বেঁধে চড়াও হওয়া বা হেনস্তা করা যেন নিত্যদিনের ঘটনা। যে যুবসমাজের মেতে থাকার কথা ছিল শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান আর সৃষ্টিশীলতা নিয়ে, তারা আজ সমাজকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক অন্ধকার চোরাবালিতে।

এই নৈতিক ধসের পেছনে একক কোনো কারণ নেই; এটি সামষ্টিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা জিপিএ-৫ আর মুখস্থবিদ্যার পেছনে ছুটতে গিয়ে একজন ‘ভালো মানুষ’ গড়ার নৈতিক শিক্ষা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। পরিবারগুলোও সন্তানকে মূল্যবোধ শেখানোর চেয়ে প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে ঠেলে দিচ্ছে। পাশাপাশি, ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউবের মতো মাধ্যমের অ্যালগরিদম উগ্রতা ও নেতিবাচকতাকে বেশি প্রমোট করছে। সস্তা লাইক-কমেন্টের আশায় তরুণেরা উগ্র আচরণকে ঢাল বানাচ্ছে। সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো, মব সৃষ্টি করে কাউকে আক্রমণ করার পর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীদের দুঃসাহস বেড়েই চলেছে। সমাজে আজ এমন আইডল বা তরুণ নেতারও বড্ড অভাব, যাঁদের দেখে তরুণেরা অনুপ্রাণিত হতে পারে।

এই অবক্ষয়ের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সামষ্টিক উন্নয়নে। দেশে আজ বড় কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নেই, বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানোর মতো উদ্ভাবক বা কালজয়ী সাহিত্যিক তৈরির ধারা থমকে গেছে। যারা ফ্রিল্যান্সিং বা ছোটখাটো উদ্যোগ নিয়ে গ্লোবাল মার্কেটে লড়াই করছেন, তাঁরাও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পিষ্ট। উৎপাদনশীলতা বাদ দিয়ে পুরো সমাজ যেন আজ এক অস্থিরতার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। চারদিকে শুধু অনর্থক ‘আন্দোলন’-এর হিড়িক, যা প্রকৃত প্রতিবাদের ভাষাকেই আজ প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মানুষ আর এই অনর্থক অস্থিরতা দেখতে চায় না, মানুষ চায় শান্তি।

এই ‘ভাইরাস’ আক্রান্ত সমাজ থেকে মুক্তি পেতে হলে এখনই জরুরি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমেই শিক্ষায় সংস্কার আনতে হবে। জিপিএ-৫ এর অন্ধ দৌড় বন্ধ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নৈতিকতা, সহনশীলতা, সাইবার এথিকস এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর জোর দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। বাবা-মাকে সন্তানের ডিজিটাল অ্যাক্টিভিটি ও আচরণের দিকে নজর রাখতে হবে, যাতে সন্তানকে শুধু সফল নয়, বরং একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। এছাড়া মব জাস্টিস বা দলবদ্ধ হেনস্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ সমাজকে কেউ যেন ব্রেনওয়াশ করে ভিন্নখাতে পরিচালিত করতে না পারে, সেদিকেও কর্তৃপক্ষের কড়া নজরদারি থাকতে হবে।

তবে যুবসমাজকে শুধু দোষারোপ করলেই সমাধান আসবে না। তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে ইতিবাচক নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। নেতৃত্ব মানে কেবল রাজনীতি নয়; নেতৃত্ব মানে সমাজ সংস্কার, বিজ্ঞান চর্চা, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ এবং সমাজসেবার মতো ইতিবাচক কাজে এগিয়ে আসা। তরুণদের মধ্য থেকেই এমন সৎ, দূরদর্শী ও শিক্ষিত নেতৃত্ব বেরিয়ে আসতে হবে, যারা বোঝাতে পারবে উগ্রতা কোনো বীরত্ব নয়। প্রকৃত বীরত্ব হলো সহনশীলতা, অন্যের প্রতি সম্মান আর দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া।

আমাদের আবারও সেই স্কুলের হুজুরের দেওয়া সহজ পাঠে ফিরে যেতে হবে। চিৎকার-চেঁচামেচি আর বিভেদের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে দেশকে দিতে হবে সভ্যতা, নৈতিকতা, নতুন আবিষ্কার আর অর্থনৈতিক মুক্তি। আসুন, একে অপরকে সম্মান করতে শিখি। কারো ক্ষতি না করে, যুবসমাজকে সাথে নিয়ে এক সুস্থ ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলি। দিনশেষে, হুজুরের সেই উপদেশই
হোক আমাদের পথচলার মূলমন্ত্র”তোরা শুধু ভালো মানুষ হ।”

ইমতিয়াজ আহমেদ
প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইয়ুথ থিংকট্যাঙ্ক

বাংলাদেশ চিত্র অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সর্বশেষ সব খবর